Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Courtesy of ARTCON
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে, দেয়ালে দেয়ালে রহস্যময় শিল্পীর আঁকা ‘হবেকি?’ সিরিজের সর্বশেষ গ্রাফিতি দেখা গেছে ভারতের সিকিমে।
জুন মাসের শেষ দিনটিতে সিকিমের গ্যাংটক-রংপো রোডের মাঝিতার নালা ব্রিজের একটি দেয়ালে আঁকা হয়েছে সেটি।
কনক্রিটের দেয়ালে স্প্রে পেইন্ট এবং স্টেনসিল দিয়ে আঁকা গ্রাফিতিটি দৈর্ঘ্যে প্রায় কুড়ি ফুট, আর চিত্রকর্মের শেষ প্রান্তে শিল্পীর সিগনেচার ট্যাগ ‘হবেকি?’ রয়েছে।
গ্রাফিতিতে দেখা যাচ্ছে, এলোমেলো দীর্ঘ চুলে, জুতা পায়ে একটি হ্যামক বা ঝুলন্ত বিছানায় শুয়ে আছেন সুবোধ।
হ্যামকটির উভয় প্রান্তই কাঁটাতারের সাথে বেঁধে ঝুলানো।
সুবোধের ডান হাতে একটি ওয়্যার কাটার বা কাটাতার কাটার যন্ত্র ধরে রাখা আছে, অন্য হাতটি হ্যামকের বাইরে ঝুলছে। সুবোধের ঠিক নিচ বরাবর একটা বালতি রাখা।
গ্যাংটক-রংপো রোডের মাঝিতার নালা ব্রিজ এলাকার বাসিন্দারা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে তারা ওই দেয়ালে গ্রাফিতিটি দেখতে পাচ্ছেন।
এই গ্রাফিতি এমন এক সময়ে আঁকা হয়েছে, যখন অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারত থেকে কথিত বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো নিয়ে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা চলছে।
এর মাত্র দুইদিন আগে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যটক ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছে ভারত।
‘হবেকি?’র রহস্যময় নাম-না-জানা শিল্পীর কাজের ডকুমেন্টেশনের কাজ করে আর্টকন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
আর্টকনের প্রতিষ্ঠাতা এআরকে রিপন বিবিসিকে জানিয়েছেন, সিকিমের গ্রাফিতির পেছনে ভাবনা এবং স্থান নির্বাচনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, কাটাতার, কাটতার কেটে ফেলার যন্ত্র এবং তিস্তা নদীর পানি – এসব বিষয়ের সংযোগ রয়েছে।
মি. রিপন বলেছেন, “রংপো শহরটি মূলত সিকিমের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। গ্যাংটকের দিকে যাওয়ার পথে সিকিমে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পয়েন্ট এটি, যেখানে যাতায়াত, আগমন, নথিপত্র এবং অনুমতি ইতিমধ্যেই দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই ভৌগোলিক অবস্থান গ্রাফিতিটিকে কেবল একটি ছবির চেয়েও বেশিকিছুতে রূপান্তর করেছে। এটি হয়ে উঠেছে একটি সীমান্ত ঘটনা।”
ছবির উৎস, Courtesy of ARTCON
সুবোধের বার্তা…প্রতিবাদ বা সারকাজম
বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশক ধরে ‘হবেকি?’ ট্যাগ জুড়ে দিয়ে রহস্যময় শিল্পীর আঁকা সুবোধ সিরিজের গ্রাফিতিগুলো প্রায় সব সময়ই কোন না কোন বার্তা দিয়েছে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হচ্ছে স্টেনসিল মানে টিনের পাতে বস্তুর আকৃতি দিয়ে কালি ব্যবহার করে গ্রাফিতি আঁকেন।
এবং প্রতিটি চিত্রকর্মেই কোন একটি বার্তা থাকে।
‘হবেকি?’র শিল্পীর নাম জানা যায়নি, তাকে কখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি – দেয়ালে আঁকা চিত্রকর্মগুলোর মালিকানা দাবি করতেও দেখা যায়নি কাউকে।
এই সিরিজের জন্ম ঠিক কবে বা কোন তারিখে জানা যায়নি।
তবে, ২০১৭ সালের দিকেই সুবোধ সিরিজের গ্রাফিতিগুলো মানুষের নজরে ও আলোচনায় আসে। ওই সময়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও শিল্পীর নামপরিচয় জানার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়।
সুবোধ সিরিজের আলোচিত গ্রাফিতির মধ্যে রয়েছে —
‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না’ – ঢাকার আগারগাঁওয়ের রাস্তায় আঁকা এ গ্রাফিতিতে দেখা গিয়েছিল হলুদ রঙয়ের সূর্য খাঁচায় বন্দি করে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছেন এক যুবক।
‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নেই’ – এই গ্রাফিতিতে খাঁচাবন্দি হলুদ সূর্য নিয়ে কপালে হাত রেখে বসে পড়েছে সুবোধ।
‘সুবোধ, কবে হবে ভোর?’ – এই গ্রাফিতিতে দেখা যায়, এক বাচ্চা মেয়ে সুবোধকে প্রশ্ন করছে।
‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না, মানুষ ভালবাসতে ভুলে গেছে!’ – এই গ্রাফিতিতে দেখা যায়, খাঁচাবন্দি সূর্য নিয়ে কোথাও চলেছে সুবোধ, যেতে যেতে পেছনে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে।
‘সুবোধ এখন জেলে! পাপবোধ নিশ্চিন্তে করছে বাস মানুষের হৃদয়ে’ – গ্রাফিতিতে দেখা যায়, জেলের গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন সুবোধ।
ছবির উৎস, Courtesy of ARTCON
‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, ভুলেও ফিরে আসিস না!’ – এই গ্রাফিতিতে খাঁচাবন্দি সূর্যটাকে তুলে ওঠানোর ভঙ্গিতে দেখা যায় সুবোধকে।
‘সুবোধ তুই ঘুরে দাঁড়া’ – এই গ্রাফিতিতে দেখা যায় খাঁচায় লাল সূর্য নিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সুবোধ।
‘দিস ইজ মাই মাস্টারপিস’ বাংলাদেশে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ঢাকার দেয়ালে করা এই গ্রাফিতিতে দেখা যায় বাংলাদেশের পতাকা আঁকা একটি চিত্রকর্ম বুকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন একজন তরুণী।
সবশেষ ঢাকার আগারগাঁও-মহাখালি লিংক রোডে বিমানবাহিনীর দেয়ালে যে গ্রাফিতিটি আঁকা হয়েছিল, তাতে সুবোধকে দেখা যায় হাঁটু মুড়ে এক শিশুকে আলিঙ্গন করে আছেন তিনি।
শিশুটির মাথায় সৈনিকের হেলমেট, হাতে বাংলাদেশের একটি ছোট্ট পতাকা।
সুবোধের কোমড়ে বাঁধা বেল্টের পেছনে ঝুলছে পেইন্ট স্প্রে ক্যান আর একটা পেইন্ট ব্রাশ।
চলতি বছরের মার্চে চট্টগ্রামের সিআরবি হিলের আঁকা গ্রাফিতিতে দেখা যায় একটি গাধার পিঠে ভাস্কর্য সদৃশ একজন মানুষ বসে আছেন – দেয়ালে সিগনেচার ট্যাগ ‘হবেকি?’ রয়েছে।
হবেকি?’র গ্রাফিতিগুলো ২০১৭ সালেই ব্যাপকভাবে নজর কাড়ে।
ঢাকার আগারগাঁও, মহাখালী ও পুরাতন বিমানবন্দরের দেয়ালেই সুবোধ গ্রাফিতি দেখা গিয়েছে বেশি।
সুবোধ সিরিজ বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় একটি সিরিজ। হবেকি?’র অনুপ্রেরণায় ছবি ও গ্রাফিতি আঁকেন বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক শিল্পী।
বাংলাদেশের গানের দল ইনদালো ‘হবেকি?’কে নিয়ে গান লিখেছে।
‘হবেকি গ্রাফিতি ফ্যানস’ নামে ফেসবুকের একটি পেজ থেকে জানা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে এবং ধর্মান্ধতা, শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ – এমন নানা সামাজিক ইস্যু নিয়েই হয় সুবোধ সিরিজের গ্রাফিতি।
হবেকি’র কাজের সাথে অনেকেই যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত স্ট্রিট পেইন্টার ব্যাঙ্কসির কাজের সাদৃশ্য খুঁজে পান।
ব্যাঙ্কসি স্টেনসিল ব্যবহার করে গ্রাফিতি আঁকেন, এবং ব্যাঙ্কসি নামটিও ছদ্মনাম।
তার আসল নাম জানা যায়নি, ঠিক যেমন জানা যায়নি হবেকি’র শিল্পীর নামও।
ছবির উৎস, Courtesy of ARTCON




