Home LATEST NEWS BANGLA জাতীয় সংসদে প্রথম ওয়াকআউট কবে ও কেন হয়েছিল

জাতীয় সংসদে প্রথম ওয়াকআউট কবে ও কেন হয়েছিল

3
0

Source : BBC NEWS

জাতীয় সংসদ ভবন

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদ সদস্যদের বিশেষ করে বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের ঘটনা অনেকটাই নিয়মিত ঘটনা এবং এটি সংসদে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে স্বীকৃত।

সংসদে কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে বিরোধী দল বা কোনো সদস্য ইচ্ছাকৃতভাবে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলে তাকে ওয়াকআউট বলা হয়।

বাংলাদেশের সংসদে বিরোধী দল কিংবা স্বতন্ত্র সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংসদে সরকার বা সরকারি দলের কোনো কোনো সিদ্ধান্ত বা বক্তব্যের প্রতিবাদে কিংবা সংসদে কথা বলার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করে ওয়াকআউট করেছেন।

আজ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই ওয়াকআউট করেছে সংসদের বিরোধী দল। সরকারি দলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে এবং একপেশেভাবে সংসদ পরিচালনার অভিযোগ এনে সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান বিরোধী দলের নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত হওয়া রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি করেছিলেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিরোধী জোট। সরকারি দল বিএনপি তাতে সায় না দেওয়ায় রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর আগে প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের সদস্যরা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাতীয় সংসদের ইতিহাসে প্রথম ওয়াকআউট কে বা কোন দল করেছিল এবং কেন করেছিল।

ওয়াক আউটের ঘটনা সংসদ বিবরণীতে এভাবে উল্লেখ আছে

প্রথম সংসদ ও প্রথম ওয়াকআউট

১৯৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে গঠিত হয়েছিল গণপরিষদ, যার সদস্য ছিল মোট ৪৬৯ জন।

এর মধ্যে ১৬৯ জন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং ৩০০ জন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য। এই গণপরিষদ ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত অস্থায়ী সংসদ হিসেবে কাজ করেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ। ওই নির্বাচনে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও কোনো কোনো জায়গায় নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ারও অভিযোগ করেছিল।

সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতেই জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা। আর এর বাইরে জাসদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ একটি আসনে এবং পাঁচটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছিলেন।

ওই সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ১৯৭৩ সালের ৭ই এপ্রিল। বিরোধী পক্ষে পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য না থাকায় ওই সংসদে প্রথাগত স্বীকৃত বিরোধী দল ছিল না।

এমনকি তখন বর্তমান জাতীয় সংসদের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় অধিবেশন বসতো তেজগাঁওয়ে পুরনো সংসদ ভবনে, যেই ভবনটি এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সংসদের পুরনো রেকর্ড ও সেসময়ের সংবাদপত্রের খবরগুলো দেখে বোঝা যায়, বিরোধী দল তেমন না থাকলেও ওই সংসদের প্রথম দিন থেকেই নানা সাংবিধানিক ইস্যুতে বিতর্ক হয়েছে। এমনকি ওই সংসদের প্রথম দিনে সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার আগে ও পরে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল।

সংসদের প্রথম দিনে আছাদুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন মুহম্মদুল্লাহ ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ।

প্রথম সংসদ অধিবেশনের সময় বর্তমান এই সংসদ ভবন তখনো চালু হয়নি

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN

সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ এবং সংসদ বিষয়ে অভিজ্ঞ সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী উভয়েই সংসদের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত বিবরণীর উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, ওই সংসদেরই চতুর্থ অধিবেশনে প্রথম ওয়াকআউটের ঘটনাটি ঘটেছিল।

সংসদের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত বিবরণী অনুযায়ী, তখনকার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. আবদুল্যা সরকার তাকে সংসদে বক্তব্য দিতে না দেওয়ায় ওয়াকআউট করেছিলেন ১৯৭৪ সালের ২১শে জানুয়ারি তারিখে।

“জনাব মো. আবদুল্যা সরকার: জনাব স্পিকার সাহেব, গতকাল ঢাকা শহরে জনগণের ওপর রক্ষীবাহিনী যে ঘৃণ্য অত্যাচার চালিয়েছিল সে সম্পর্কে আমাকে সংসদে বক্তব্য রাখতে না দেওয়ায় আমি ‘ওয়াকআউট’ করছি। [সদস্যের কক্ষ ত্যাগ]। “—এভাবেই লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত সংসদীয় কার্যক্রমের বিবরণীতে উল্লেখ আছে।

বর্তমানে প্রয়াত মি. সরকার ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদে গিয়েছিলেন। পরে ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে তিনি জাসদে যোগদান করেন।

বাকশালে যোগদান করতে অপারগতা প্রকাশ করায় ১৯৭৫ সালের ২৮শে এপ্রিল আবদুল্যা সরকারের (সংসদের বিবরণীতে এভাবে লেখা থাকলেও অনেক জায়গায় তার নাম আবদুল্লাহ সরকার হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়) আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।

দৈনিক বাংলায় পরদিনে ‘সংসদে আবদুল্লাহ সরকার ও ময়নুদ্দিন মানিকের আসন শূন্য ঘোষণা’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয়েছিল, “কুমিল্লা-২ থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব আবদুল্লাহ সরকার ও রাজশাহী ১১ থেকে নির্বাচিত জনাব ময়নুদ্দিন আহমদ মানিকের আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে”।

ওই খবরে বলা হয়, “বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের এক বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার একথা জানিয়ে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময় ২৫শে এপ্রিলের মধ্যে জাতীয় দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে যোগদান না করায় সংবিধানের ১১৭-ক অনুচ্ছেদের ৫(ক)দফা অনুসারে ১৯৭৫ সালের ২৬শে এপ্রিল সকাল থেকে সংসদে এই দুজন সদস্যের আসন শূন্য হয়েছে”।

২০১৩ সালে মৃত্যুর আগে সবশেষ বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন।

১৯৭৪ সালের ২২শে জানুয়ারির দৈনিক ইত্তেফাকে ওয়াক আউটের খবর

ছবির উৎস, songramernotebook.com

ওয়াকআউটের প্রেক্ষাপট কী ছিল

সংসদে সংরক্ষিত বিবরণীতে দেখা যাচ্ছে ঘটনাটির বর্ণনা এভাবে দেওয়া আছে:

“জনাব মো. আবদুল্যা সরকার: জনাব স্পিকার সাহেব, অন আ পয়েন্ট অব অর্ডার। গতকাল ২০শে জানুয়ারি রোজ রবিবার ঢাকা শহরে জনগণের ওপর রক্ষীবাহিনী যে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল সে সম্পর্কে আমি বলতে চাই যে….।

শ্রী মনোরঞ্জন ধর (আইন ও সংসদ বিষয়াবলী মন্ত্রী) : জনাব স্পিকার সাহেব, দিজ ইজ নো পয়েন্ট অব অর্ডার।

[বাধা প্রদান]

জনাব মো. আবদুল্যা সরকার: জনাব স্পিকার সাহেব, গতকাল ঢাকা শহরে জনগণের ওপর রক্ষীবাহিনী যে ঘৃণ্য অত্যাচার চালিয়েছিল সে সম্পর্কে আমাকে সংসদে বক্তব্য রাখতে না দেওয়ায় আমি ওয়াকআউট করছি।

[সদস্যের কক্ষ ত্যাগ]।

শ্রী মনোরঞ্জন ধর: জনাব স্পিকার সাহেব, মাননীয় সদস্য জনাব আবদুল্যা সরকার যে ভাষণ দিয়েছেন তা সংসদের কার্য-বিবরণী থেকে বাদ দেয়া হোক।”

এই বিবরণী থেকে বোঝা যায় যে মি. সরকার ১৯৭৪ সালের ২০শে জানুয়ারি ঢাকায় তখনকার রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে নির্যাতন বা নিপীড়নের কোনো অভিযোগ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্পিকার তাতে সম্মতি দেননি।

দৈনিক ইত্তেফাকের ১৯৭৪ সালের ২২শে জানুয়ারি সংখ্যায় “শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম ওয়াক-আউট: বিরোধী সদস্যের মূলতবী প্রস্তাব নাকচ” শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এই সংবাদের দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, “বিরোধীমনা সদস্যদের অভিমত ব্যক্ত করার অবকাশ না দেওয়ায় স্বতন্ত্র সদস্য জনাব আবদুল্লাহ সরকার ওয়াকআউট করেন। ইহাই ছিল শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম ওয়াকআউট। অন্যান্য বিরোধী মনা সদস্যরা অবশ্য স্ব স্ব আসনেই অধিষ্ঠিত থাকেন”।

১৯৭৪ সালের ২০শে জানুয়ারি ঢাকা জাসদের কর্মসূচিকে ঘিরে সহিংসতার খবর ইত্তেফাকে পরদিনের পত্রিকায় এভাবেই উঠে এসেছিল।

ছবির উৎস, songramernotebook.com

দৈনিক বাংলার ওই দিনের পত্রিকায় সংসদ গ্যালারী থেকে শীর্ষক সংবাদে বলা হয়, ” গতকাল জাতীয় সংসদে নির্দলীয় সদস্য জনাব আবদুল্লাহ সরকার একাকী ওয়াকআউট করেন। যে প্রসঙ্গটি নিয়ে তিনি ওয়াকআউট করেন সেই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছিলেন জাসদ সদস্য জনাব সাত্তার। কিন্তু জনাব সাত্তার জনাব আবদুল্লাহ সরকারের সঙ্গে ওয়াক আউটে যোগ দেননি। জনাব সাত্তার গতকাল একটি মুলতবী প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ দিয়েছিলেন। এই সংসদে মুলতবী প্রস্তাব উত্থাপনের চেষ্টা এটাই প্রথম”।

পত্রিকাটির ওই খবর অনুযায়ী সংসদে তখন ডেপুটি স্পিকার মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ সভাপতিত্ব করছিলেন। তিনি নোটিশটি নাকচ করে দেন। এরপরই আবদুল্যা সরকার বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করে পয়েন্ট অব অর্ডারে রক্ষীবাহিনী নিয়ে অভিযোগ করে আলোচনার দাবি জানান। কিন্তু তাকে বক্তব্য দিতে না দেওয়ায় তিনি ওয়াকআউট করেন।

ওই সময়ের দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক আজাদের খবর অনুযায়ী ১৯৭৪ সালের ২০শে জানুয়ারি তখনকার বিরোধী দল জাসদ ‘গণ প্রতিরোধ দিবস’ ও সকাল থেকে বেলা দুটা পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচি পালন করেছিল।

এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ১৪৪ ধারা জারি করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিরোধী দলগুলো তা লঙ্ঘন করে মিছিল সমাবেশ শুরু করলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে রক্ষীবাহিনী, বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) ও পুলিশের ব্যাপক হামলা ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে।

ইত্তেফাকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, “গতকাল ঢাকার বিভিন্ন ঘটনায় ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চেষ্টার অভিযোগে রক্ষীবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশ বেশ কিছু লোককে গ্রেফতার করিয়াছে। কাঁদুনে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও অন্যান্যভাবে আনুমানিক অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হইয়াছে….।”

ঘটনার পরদিন একুশে জানুয়ারি এ ঘটনা সম্পর্কেই সংসদে বক্তব্য রাখতে চেয়েছিলেন আবদুল্যা সরকার। কিন্তু সেই সুযোগ না পেয়ে ওয়াকআউট করেন তিনি।