Home LATEST NEWS BANGLA বাংলাদেশে কি সন্তান দত্তক নেওয়া যায়?

বাংলাদেশে কি সন্তান দত্তক নেওয়া যায়?

3
0

Source : BBC NEWS

একটি শিশুর হাত ধরে আছেন একজন নারী

ছবির উৎস, Getty Images

“বিয়ের সাত বছরে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, সিঙ্গাপুরে ডাক্তার দেখিয়েছি। তবুও স্ত্রী কনসিভ করছিলো না দেখে অবশেষে বাচ্চা দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু এখানেও বিপদ। বাচ্চা দত্তক নেয়াটা ভয়াবহ জটিল,” এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফ সালেহীন।

গোপনীয়তার স্বার্থে মি. সালেহীনের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলছিলেন, আইনি জটিলতা এড়াতে স্ট্যাম্প কাগজে সই করে ছয় বছর আগে ২০১৯ সালে শিশু দত্তক নিয়েছেন।

মূলত, বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় পাওয়া যায় শিশুর অভিভাবকত্ব।

“আমার মেয়ে তার আসল বাবা-মায়ের ষষ্ঠ সন্তান ছিল। ওর যখন ১৮ দিন তখন তাদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নিয়ে চুক্তি করি যে এই মেয়ের ওপর তাদের আর কোনো অধিকার থাকবে না। তারা কখনো ওকে নিতে পারবে না। বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা দেই তাদের,” বলছিলেন মি. সালেহীন।

আইনজীবীরা বলছেন এভাবে স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে সন্তান দত্তক নেওয়াটা আইনসিদ্ধ নয়। প্রতিটি ধর্মের ‘পারসোনাল ল’ দিয়ে দত্তক নেওয়ার এই প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতিটি ধর্মের আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় বিধান দ্বারা পরিচালিত নিয়মই মূলত ‘পারসোনাল ল’।

প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশে নিঃসন্তান দম্পতিরা শিশু দত্তক নাকি অভিভাবকত্ব- কোনটা নিতে পারেন? দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন আইন অনুসরণ করা হয়? কী ধরনের পরিস্থিতি বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় তাদের?

আদালতের মাধ্যমে শিশু দত্তকের প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

দত্তক নাকি শিশুর অভিভাবকত্ব?

বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা লুৎফা নাজনীন (ছদ্মনাম) বিয়ের ১১ বছরেও সন্তান না হওয়ায় বছর দু’য়েক আগে শিশু দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরিচিতজনদের মাধ্যমে খোঁজ খবর নিয়ে আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন বলে জানতে পারেন মিজ নাজনীন।

“আইনজীবীরা বললেন দত্তক (আইন) নাই দেশে, গার্ডিয়ানশিপ (অভিভাবকত্ব) পাবো। পরে আজিমপুরের সরকারি শিশু সদনে খোঁজ নেই। সেখান থেকে দেড় মাস বয়সী এক মেয়ে শিশুকে আমি পছন্দ করি। তিন দিন বয়সে ওই শিশুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে গিয়েছিলো,” ওই মেয়েকে নেওয়ার জন্য আমি পারিবারিক আদালতে আবেদন করি।

আদালতে বেশ কয়েক মাস শুনানির পর কিছু শর্ত সাপেক্ষে ওই শিশুর অভিভাবকত্ব পান মিজ নাজনীন।

মিজ নাজনীন বলেন, “আদালত মেয়ের কল্যাণে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়ালেখার খরচ বাবদ একটা ভালো অ্যামাউন্টের টাকা এফডিআর করে দিতে বলেন।”

“সেটার প্রমাণ হিসেবে সরকারি অফিসে রশিদও জমা দিয়েছি আমি। আদালত যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিল যে আমি এই শিশুর দায়িত্ব নিতে পারবো, তখন আমাকে গার্ডিয়ান করে রায় দিল,” বলেন তিনি।

তবে এই আইনি প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং আদালতসহ সরকারি বিভিন্ন কার্যালয়ে দৌড়-ঝাঁপ করার অভিজ্ঞতার কথা জানান মিজ নাজনীন।

আইনজীবীরা বলছেন মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। অনেক সময়ই শিশু দত্তক নেওয়ার যে কথা শোনা যায় সেটি আসলে দত্তক নয়, বরং শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া।

আইনি এই প্রক্রিয়ায় শিশুকে নিজের জিম্মায় রাখা যায়, কিন্তু এটি পুরোপুরি মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব নয়। এই প্রক্রিয়ায় যে কেউই শিশুর অভিভাবক হতে পারেন।

ফলে অভিভাবকত্ব পাওয়া, আর দত্তক নেওয়া একেবারেই ভিন্ন বলে জানান আইনজীবীরা।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়াহ) অনুযায়ী এতিম বা অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা যাবে। কিন্তু সন্তানের বাবা – মার নামের জায়গায় লালনপালনকারী বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করা যাবে না। কারণ ইসলামে এর বৈধতা নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট – ১৮৯০ অনুযায়ী কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব যে কেউ পেতে পারেন। বাংলাদেশে মুসলিম আইনে দত্তকের কনসেপ্টই নেই। তাই গার্ডিয়ানশিপ পাওয়া আর দত্তক নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।”

মিজ সানজানা বলছেন, কোনো সন্তানকে নিয়ে যদি বিরোধ না থাকে তবে অল্প কয়েকটি শুনানির মাধ্যমে আইনি এই প্রক্রিয়ায় অভিভাবকত্ব পান আগ্রহীরা।

কিন্তু যদি কোনো বিরোধ বা জটিলতা থাকে তবে তা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া হয়। রায় বিরুদ্ধে গেলে আপিল করার সুযোগেও এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।

তবে এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে আদালত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও সর্বোত্তম কল্যাণ বিবেচনা করে বলে জানান মিজ সানজানা।

শিশুর পা

ছবির উৎস, Getty Images

হিন্দু ধর্মে দত্তক

হিন্দু ধর্মে উত্তরাধিকার আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী সন্তান দত্তক নেওয়া যায়। এই আইনে দত্তক সন্তান ও বায়োলজিক্যাল সন্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না।

উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশের পর শুধু ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে দত্তকের বিষয়টি আইনসিদ্ধ।

অর্থাৎ শুধু ছেলে শিশুই দত্তক নেওয়া যাবে। এই আইনে অভিভাবকত্ব নয়, দত্তককেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত বা বিপত্নীক যে কোনো পর্যায়ে দত্তক নিতে পারবেন। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাবদ্ধতা।

একজন অবিবাহিত হিন্দু নারী সন্তান দত্তক নিতে পারেন না। বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন হয়।

হিন্দু বিধবা নারীকেও সন্তান দত্তক নিতে হলে স্বামীর মৃত্যুর আগে দেওয়া অনুমতিপত্র দেখাতে হবে।

খ্রিস্ট ধর্মে যা বলা হয়েছে

মুসলিম ধর্মের মতো এই খ্রিস্ট ধর্মেও দত্তকের কোনো বিধান নেই। এই ধর্মের অনুসারীরা শুধু সন্তানের অভিভাবকত্ব নিতে পারবেন।

গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাও মুসলিমদের মতো শিশুর অভিভাবকত্ব পাবেন।

কেন শিশু দত্তক নেওয়া যায় না বাংলাদেশে?

১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার কনভেনশন গৃহীত হয়। এই কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও দত্তক গ্রহণ বিষয়ক অনুচ্ছেদের ২১ ধারায় অণুস্বাক্ষর করেনি।

এর মূল কারণ মুসলিম ধর্মীয় বিধানে দত্তক নেওয়া স্বীকৃত না।

যুদ্ধ-শিশুদের পুনর্বাসনের বিষয়টি আমলে নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়। সেই আইনে এতিম আর পরিত্যক্ত শিশুদের দত্তক নেওয়াকে আইনসিদ্ধ করা হয়েছিল।

১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে শিশু দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সে সময় নেদারল্যান্ডসে যেসব শিশুদের দত্তক নেওয়া হয়েছিল সেক্ষেত্রে এরকম অনিয়ম পাওয়া গিয়েছিল।

পরবর্তীকালে শিশু পাচার বা ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনার প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালে আইনে সংশোধনী এনে বিদেশিদের শিশু দত্তক দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাতিল হওয়ার আগে এই আইনের আওতায় বহু যুদ্ধশিশু ও পরিত্যক্ত শিশুকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল।

তবে বিদেশে বসবাসকারী, কিন্তু বাংলাদেশি নাগরিকত্ব আছে এমন কেউ হলে তাকে অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুকে নিজ জিম্মায় নিতে পারবেন।

দেশের বাইরে শিশুকে নিতে হলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে আবেদন করে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নেওয়া যাবে বলে জানান আইনজীবীরা।

ইলাস্ট্রেটেড ছবিতে একটি শিশুর ওপর দুটি হাত, প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images/Mary Long

পালক সন্তান কি সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে?

আইন অনুযায়ী, বায়োলজিক্যাল সন্তান ছাড়া পালক সন্তান কখনো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না।

অভিভাবক হিসেবে সন্তান লালন-পালন করলেও মুসলিম ও খ্রিষ্টান আইন অনুসারে এমন শিশুরা সম্পত্তির অধিকার পাবেন না বলে জানান আইনজীবী মিজ সানজানা।

তবে বাংলাদেশে মুসলিমদের ক্ষেত্রে পালক সন্তানকে হেবা বা উপহার হিসেবে সম্পত্তি দেওয়ার চর্চা থাকলেও এটি বৈধ নয় বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

মিজ সানজানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হেবা করতে গেলেও দেখাতে হবে এটা ফাস্ট ব্লাডের মধ্যে। দাদা, দাদী, নানা, নানি এর বাইরে হেবা করা যায় না। তবে দেশে অনেকেই এটা করেন। কিন্তু তাদের এটা জালিয়াতি করে করতে হয়।”

তবে মুসলিমরা ওসিয়তের মাধ্যমে পালক শিশুকে সম্পত্তি দান করতে পারেন। পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করা যায় না।

“এটা মৃত্যুর পরে কার্যকরী হয়। মোট সম্পত্তির এক – তৃতীয়াংশ ওসিয়ত করতে পারবে আইনানুযায়ী। পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করার কোনো সুযোগ নাই,” বলেন মিজ সানজানা।

তবে এই প্রক্রিয়াতেও কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে।

পালক বাবা-মার মৃত্যুর পরে পালক সন্তানকে ওই সম্পত্তি ভোগ করতে হলে অন্যান্য ওয়ারিশদের (সম্পত্তির উত্তরাধিকার) অনাপত্তি নিতে হয়।

পালক সন্তানকে আরেকটি আবেদনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।