Source : BBC NEWS

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
আগামী বছর ছয়ই জুনের আগে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত এক বৈঠকের পর তিনি এই কথা জানিয়েছেন।
একইসঙ্গে, ইউপি নির্বাচনের পূর্বঘোষিত সম্ভাব্য সময় নিয়ে আগের পরিকল্পনা থেকে ইসি সরে আসেনি বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর আগে, সোমবার সাতটি ধাপে নির্বাচন করার পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য সময়ের কথা জানিয়েছিলেন এই নির্বাচন কমিশনার।
কিন্তু প্রথম ধাপে ১২ই নভেম্বর ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না এমন প্রশ্নে মি. সানাউল্লাহ জানান, বাজেট প্ল্যানিংসহ আনুষঙ্গিক বৈঠক করে পরবর্তীতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত সময়সূচি জানানো হবে।
নির্বাচন কমিশনার মি. সানাউল্লাহ বলেন, “আজকে যে উপাত্ত পেয়েছি, আমরা তো এখনো কমিশন মিটিং করি নাই। এই উপাত্তের আলোকে কমিশন একটা সিদ্ধান্ত নেবে।”
ছবির উৎস, Screen Grab
ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসির বৈঠকে যেসব সিদ্ধান্ত
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল সেভাবেই এই ইউপি নির্বাচনেও করা হবে বলে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন মি. সানাউল্লাহ।
একইসঙ্গে, জাতীয় নির্বাচনের মতোই এই ইউপি নির্বাচনের সময়ও সব ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও জানান তিনি।
“সুতরাং সেখানে সেনাবাহিনী থেকে সংশ্লিষ্ট সকল বাহিনীই থাকবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে আজকের সভায় আমি যদি এক লাইনে কনক্লুশানটা বলি- সবাই এটা সম্মত হয়েছেন যে, আমাদের এই নির্বাচনটা পারতপক্ষে ছয়ই জুনের আগেই সম্পন্ন করতে হবে এইচএসসি পরীক্ষার আগে,” বলেন নির্বাচন কমিশনার মি. সানাউল্লাহ।
এ বছর বন্যায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের কার্যক্রমে ব্যাঘাতের বিষয়টিও এই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এই বৈঠকে ইউপি নির্বাচনের কারণে যাতে ওই সময় কোন পরীক্ষায় ব্যাঘাত না ঘটে সে বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান এই নির্বাচন কমিশনার।
“আমাদের একজন শিক্ষককে অন্ততপক্ষে এক সপ্তাহের জন্য প্রয়োজন হয় প্রশিক্ষণ, সমন্বয় এবং ডিউটির জন্য। তারা যেন তাদের মূল্যায়নের কাজ করতে পারেন, প্রাক-প্রস্তুতির কাজগুলো করতে পারেন এবং পরীক্ষা যেন ব্যাহত না হয়। আমরা বলেছি, ডেফিনিটলি এগুলো জেনুইন কনসার্নস এবং এগুলো আমরা অ্যাড্রেস করবো,” বলেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
একইসঙ্গে, বাজেট প্ল্যানিংসহ আরো দুই-একটি বৈঠকের পর ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এবার নভেম্বর এবং ডিসেম্বর পুরো দুই মাস জুড়েই বিভিন্ন পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে বলেও উল্লেখ করে তিনি জানান, এই কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সময় ওইসময় খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে।
“আমরা জানুয়ারিতে ফাঁকা সময় পাচ্ছি কিছুটা। কিন্তু আপনারা এটাও জানেন যে, সাত বা আটই ফেব্রুয়ারি থেকে আবার রোজা শুরু। রোজা শেষ হওয়ার মাত্র একদিন পর থেকে আবার এসএসসি শুরু। এসএসসির শেষে আবার গিয়ে জুন মাসের ছয় তারিখে এইচএসসি শুরুর মাঝখানে আবার একটা সময় পাওয়া যাচ্ছে,” বলেন মি. সানাউল্লাহ।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
একইসঙ্গে, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রমের বিষয়ে পর্যালোচনা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ইসিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
“আমাদের এবারে স্পেসগুলো খুব টাইট। এই টাইট স্পেসের মধ্যে কীভাবে আমরা সব অ্যাকোমোডেট করবো এটা নিয়ে আরো একটু সাইডলাইন ওয়ার্ক করার দরকার আছে। আমাদের যে প্রাথমিক পরিকল্পনাটা ছিল, সেটার ওপর তারা সবাই মতামত দিয়েছেন। এটা নিয়ে আমরা কমিশনও বসবো এবং স্টাফ লেভেলের এবং সাচিবিক লেভেলের সমন্বয়গুলো সম্পন্ন করবেন সচিব। তারপর আমরা সুনির্দিষ্ট ডেট দিয়ে দেবো,” বলেন নির্বাচন কমিশনার মি. সানাউল্লাহ।
তিনি জানান, এই বৈঠকে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে এবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠক এবং অন্যান্য আরো দুই-একটি সভার পরে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সময় অনুযায়ী, ১২ই নভেম্বর প্রথম ধাপের নির্বাচন হচ্ছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মি. সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা সামান্যতম কোনোখান থেকে সরে আসি নাই সেটাই বলছি। আজ আমরা যে উপাত্ত পেলাম এটা নিয়ে এখন আমরা কমিশনে বসবো। বসে তারপরে আমরা নির্দিষ্ট করবো।”

ইসির সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মতপার্থক্য
প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে গত সোমবার জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
একইসঙ্গে, সাতটি ধাপে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়ও জানিয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন ইউপি নির্বাচনের প্রাথমিক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাতে আগামী ১২ই নভেম্বর প্রথম ধাপের নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারিত হয়েছিল।
সবশেষ সপ্তম ধাপের ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় আগামী বছরের ২৭শে মে নির্ধারিত হয়েছিল।
বাংলাদেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা চার হাজার ৫৮০টি।
এর মধ্যে চার হাজার ২৭২টিতে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার মি. সানাউল্লাহ।
তবে পরদিন মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এই নির্বাচনের সময়সূচির বিষয়ে সরকার কিছু জানে না।
নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে নির্বাচন করার- উল্লেখ করে মি. আলম জানিয়েছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, সরকারের সাথে আলোচনার পর প্রস্তুতি সভা বা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা করার পর তারা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে।
একইসঙ্গে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে দুইটি নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এর একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
“অন্যান্য যত নির্বাচন আছে যেগুলো নির্বাচন কমিশন করবে সেগুলো সরকারের সাথে কোলাবোরেট করেই করতে হবে,” বলেন মি. রহমান।
পরে এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের বিপরীতে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
এরপর বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে ইসি সচিব জানান, এই বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL
সবশেষ কবে হয়েছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন?
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর, পৌরসভা-উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ আবার গ্রেফতার হন।
জনপ্রতিনিধিরা আত্মগোপনে কিংবা পরিষদে না যাওয়ায় নাগরিক সেবা ব্যাহতের কারণ দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কয়েক দিনের ব্যবধানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা- উপজেলা পরিষদের মেয়র ও চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়েছিল তখন। এর মধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ ধাপে ২০২২ সালের সাতই ফেব্রুয়ারি দেশের ১৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এরপরে ওই বছরেরই ১০ই ফেব্রুয়ারি আরো আটটি ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
২০২২ সালের ওই সময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে আর কোনো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে ইসিকে চিঠি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
সিটি করপোরেশনগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধির পাঁচ বছরের মেয়াদ প্রায় বেশিরভাগেরই গত বছর শেষ হয়েছে। কয়েকটির চলতি বছরের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হয়েছে।
আইনানুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই ধাপে ঢাকাসহ ১১টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করে।
আর আদালতের আদেশে বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা পরিষদগুলোতেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি।




