Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Fiza Nazir
“আমার ছেলে থাকলে সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতো,” বছর ২৫ আগে বাবাকে এই ঠিক কথাগুলোই বলতে শুনেছিলেন ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের বাসিন্দা ফিজা নাজির।
তিনি ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের একমাত্র নারী অ্যাথেলিট যিনি ‘মিক্সড মার্শাল আর্টস’ শৈলীতে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। তার বাবা নাজির আহমেদ অবসরপ্রাপ্ত খেলোয়াড়।
এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে এই কথাগুলো বলেছিলেন নাজির আহমেদ। সেই সময়ে কাছেই খেলছিলেন ফিজা; তখন তার বয়স চার বছর।
তার কথায়, “আমি তখনই ঠিক করে ফেলি যে বড় হয়ে আমি অ্যাথেলিট হব এবং পরের বছর থেকেই আমি ট্রেনিং শুরু করে দিই।”
তিনি আরো বলেন, “স্কুল ও কলেজে পৌঁছনোর আগেই আমি জাতীয় স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে শুরু করি। মেডেলও জিততে থাকি।”
নাজির আহমেদ অবশ্য ভাবতে পারেননি তার মেয়ে মার্শাল আর্টের মতো একটা আক্রমণাত্মক খেলাকে বেছে নেবে, যেটা দেখে ছেলেরাও ভয় পায়।
“খেলাধুলার জগতে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে দেখে বাবা-মা বেশ খুশি হয়েছিলেন বটে কিন্তু বস্তুত তারা এই কারণে চিন্তিত ছিলেন যে আমি এমন এক বিপজ্জনক খেলাকে বেছে নিয়েছি যেখানে সবসময় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে,” বলছিলেন ফিজা নাজির।
ভারতের এক নম্বর মিক্সড মার্শাল আর্টস ফাইটার তিনি।
মিক্সড মার্শাল আর্টস বা এমএমএ হলো ফুল-কন্ট্যাক্ট কম্ব্যাট (এমন এক শৈলী যেখানে পূর্ণ-স্পর্শ হয়)। এমএমএ-তে একাধিক মার্শাল আর্ট শাখার বিভিন্ন ধরণের যুদ্ধ শৈলী এবং কৌশল ব্যবহার করা হয়।
ছবির উৎস, Fiza Nazir
ভারতের হয়ে দুটো স্বর্ণপদক জিতেছেন
ভারতের হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। দুটো স্বর্ণপদক-সহ দেশের হয়ে একাধিক মেডেল জিতেছেন।
তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের একমাত্র নারী মিক্সড মার্শাল আর্টস (এমএমএ) ফাইটার যিনি একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছেন।
থাইল্যান্ডে এক প্রতিযোগিতায় পাওয়া আঘাতের কারণে তিনি শ্রীনগরে ফিরে এসেছেন। খেলতে গিয়ে আঘাত পাওয়া নিয়ে অবশ্য তেমন ভ্রূক্ষেপ নেই তার। তবে তার ফাইট দেখেন না তার বাবা-মা। এর নেপথ্যে কারণটা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
ফিজা নাজিরের কথায়, “আহত হওয়াটা খেলারই একটা অংশ মাত্র। তবে আমার বাবা-মা আমার লড়াই দেখেনই না। তারা শুধুমাত্র আমি জেতার পর উদযাপনের ছবি দেখেন।”
তিনি জানিয়েছেন, মার্শাল আর্টের সঙ্গে তার সম্পর্ক সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে।
“আমি শুরুটা করেছিলাম থাং টা দিয়ে, যেটা জুডো-কারাতের মতোই একটা খেলা। কিন্তু ২০১৯ সালে অনুভব করতে থাকি যে আমার একটা বৈশ্বিক মঞ্চ প্রয়োজন। তাই মিক্সড মার্শাল আর্টসের হাত ধরে আমি নিজের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি, যেখানে আমি বড় সাফল্য অর্জন করেছি,” বলছিলেন ফিজা নাজির।
বিগত দুই বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। এখনো পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মোট ৪০টারও বেশি পদক জিতেছেন।
ছবির উৎস, Fiza Nazir
ডাক্তারি পড়ার প্রস্তুতি থেকে ফাইটিং কেজ
খেলোয়াড় হিসাবে তার ক্যারিয়ার শুরু করার আগে বাবা-মায়ের সম্মতি পাওয়ার জন্য বহু চেষ্টা করতে হয়েছিল ফিজা নাজিরকে।
ডাক্তার হওয়ার জন্য একসময় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎই ছেড়ে দেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, “আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার জায়গা (চিকিৎসক হিসাবে) হাসপাতালে নয়, আমার জায়গা ফাইটিং কেজে। নিজেকে এগুলো বোঝানোটা সহজ ছিল, কারণ একজন এমএমএ ফাইটার হয়ে ওঠার স্বপ্নটা আমার ছিল।”
“কিন্তু আমার বাবা-মা স্বাভাবিকভাবেই এই আক্রমণাত্মক খেলা নিয়ে বেশ ভয়েই ছিলেন। আর আমার এই তীব্র আবেগ দেখে শঙ্কিতও হয়ে পড়েন। কিন্তু তারপর, ধীরে ধীরে, সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।”
যে ঘেরা অংশে মিক্সড মার্শাল আর্টস খেলা হয়, তাকে ফাইটিং কেজ বলে।
গত চার বছর ধরে থাইল্যান্ডে রয়েছেন ফিজা নাজির। এর কারণ ভারতে মিক্সড মার্শাল আর্টসের প্রশিক্ষণের মান বিশ্বমানের নয়।
তিনি বলেন, “আমাকে থাইল্যান্ডে যেতে হয়েছিল। সেখানকার অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কাশ্মীরের কথা বলতে গেলে, সেখানে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোও নেই, আর মিক্সড মার্শাল আর্টস সম্পর্কে মানুষ বিশেষ কিছু জানেও না।”
“এই খেলায় বক্সিং, কিকবক্সিং এবং জুডোর সমস্ত কৌশল ব্যবহার করা হয়, এবং এর জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”




