Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
সাপ নিয়ে যত কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে, অন্য কোনো প্রাণীকে ঘিরে বোধহয় এতটা নেই। যেমন– সাপের মাথায় মণি থাকে, সাপকে আঘাত করলে সেই সাপ প্রতিশোধ নিতে বাড়িতে গিয়ে দংশন করে, ফুলের গন্ধে সাপ আসে, সাপ গাভীর দুধ চুষে খায়, কিংবা কালনাগিনীর ছোবলে নিশ্চিত মৃত্যু– এমন নানা গল্প যুগ যুগ ধরে প্রচলিত।
এসব রহস্যময় ও মুখরোচক কাহিনী নিয়ে অসংখ্য নাটক-সিনেমাও তৈরি হয়েছে।
তবে সাপ নিয়ে মানুষের ভয় শুধু এসব কুসংস্কার থেকেই তৈরি হয়নি। এদের বিশেষ দৈহিক আকৃতি, দ্রুত চলার ভঙ্গি এবং দংশনে মৃত্যুর আশঙ্কা সেই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফলে সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে মেরে ফেলার প্রবণতা দেখা যায় মানুষের মাঝে।
কিন্তু ভয় পেয়ে মানুষ যে সাপটিকে মেরে ফেলছে, সেটিই হয়তো বাংলাদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা কোনো প্রজাতি।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন বাংলাদেশ-এর ২০১৫ সালের রেড লিস্টে দেশের ৮১ প্রজাতি সাপের মূল্যায়ন করা হয়েছে।
এর মধ্যে কোনো কোনো সাপ সবচেয়ে সংকটাপন্ন বা ‘মহাবিপন্ন’ অবস্থায় আছে। রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগর হলো বাংলাদেশের একমাত্র মহাবিপন্ন সাপ।
এছাড়া, দু’টি প্রজাতি রয়েছে বিপন্ন অবস্থায়। আর পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে আট প্রজাতির সাপ হুমকির মুখে রয়েছে।
তাহলে জেনে নেওয়া যাক যে বাংলাদেশে হুমকির মুখে থাকা এই আট প্রজাতির সাপ কোনগুলো, কোথায় তাদের বসবাস এবং কী অবস্থায় তারা টিকে আছে।
ছবির উৎস, Getty Images
রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগর
বাংলাদেশে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাপগুলোর একটি রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগর, যা গোলবাহার অজগর নামেও পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম মালায়োপাইথন রেটিকুলেটাস।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বা মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটির বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
বাংলাদেশে একসময় এর বিস্তৃতি অনেক বেশি ছিল। কিন্তু পরে খুব সীমিত এলাকায় এই সাপ দেখা যেত। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সুন্দরবনে এর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও, বিশেষ করে মিশ্র চিরসবুজ বনাঞ্চলে এর বসবাস রয়েছে।
মূলত, আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড় এবং চামড়া ও মাংসের জন্য শিকারের কারণে বাংলাদেশে জাল অজগরের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমেছে।
এদিকে, চলতি বছর থেকে আইইউসিএন বাংলাদেশ তাদের সেই পুরনো রেড লিস্ট হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ আহসান। তিনি বলছেন, এটির অবস্থা উন্নতি হবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না।
তবে বন্য প্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞা মো. আবু সাইদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগরের অবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হতে পারে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবনের মতো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পাওয়া গেলেও গত বছর দুয়েক ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এগুলোকে উদ্ধার করা হয়েছে। যেমন– পঞ্চগড় বা পটুয়াখালী।
বিশ্বের দীর্ঘতম সাপগুলোর একটি হলো এই জাল অজগর। পূর্ণবয়স্ক একটি জাল অজগর তিন থেকে ছয় মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যদিও এর চেয়েও লম্বা হওয়ার নজির রয়েছে।
তবে বিশাল আকৃতির হলেও এই সাপ মোটেও বিষধর নয়।
সাপটি মূলত স্থলচর হলেও গাছে ওঠে এবং পানিতেও চলাচল করতে পারে। বন, জলাভূমি ও আশপাশের তৃণভূমিতে বাস করে এবং পানির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে।
এটি নিশাচর, মূলত একাকী থাকে এবং দক্ষ সাঁতারু।
ইঁদুর, পাখি, সরীসৃপসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী এর প্রধান খাবার। বড় জাল অজগর বুনো শূকর, হরিণজাতীয় প্রাণী এমনকি গবাদিপশুও শিকার করতে পারে।
অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, এরা বিষধর না হলেও শিকারকে ধরে চাপ দিয়ে মেরে ফেলে।
বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ প্রজাতি পাওয়া যায়।
ছবির উৎস, Getty Images
আইড ক্যাট স্নেক বা বড়চোখ ফণিমনসা
বোইগা সায়ামেনসিস বা আইড ক্যাট স্নেক বাংলাদেশে বিপন্ন প্রজাতির একটি সাপ।
স্থানীয়ভাবে এটি ‘বড়চোখ ফণিমনসা’ বা ‘চোখ-ফুটাযুক্ত ফণিমনসা’ নামেই বেশি পরিচিত।
২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এই সাপের বিস্তৃতি খুবই সীমিত এবং অল্প কয়েকটি স্থানেই এর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মিশ্র চিরসবুজ বনে এদের বাস।
এই সাপ সাধারণত গাছেই বিচরণ করে এবং এটি নিশাচর। এরা ডিম পাড়ে।
পাখি ও পাখির ডিম এদের প্রধান খাবার, তবে ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণীও খেয়ে থাকে।
বাংলাদেশে এই সাপের মোট সংখ্যা কত, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র ক্রমাগত কমে যাওয়ায় প্রজাতিটি বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই সাপ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে এর উপস্থিতি আছে।
অধ্যাপক ফরিদ আহসান জানিয়েছেন, এটির অবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হতে পারে।
ছবির উৎস, Getty Images
কালো-দাগি উদয় কাল বা ব্ল্যাক-বারড কুকরি
অলিগোডন সিনেরিয়াস বা ব্ল্যাক-বারড কুকরি স্নেক বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল একটি সাপ।
আইইউসিএনের রেড লিস্টে এটিকে ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে এটিকে ‘কালো-বের কুকরি’ বা ‘কালো-দাগি উদয় কাল’ সাপ ডাকা হয়।
বাংলাদেশে এই সাপের সংখ্যা কম বলে ধারণা করা হয়। তবে দেশে ঠিক কতটি ব্ল্যাক-বারড কুকরি স্নেক রয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আইইউসিএন-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি এলাকা থেকে এই সাপের উপস্থিতির তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এই সাপের দেখা মিলেছে। খুবই কম সংখ্যক এলাকায় উপস্থিতির কারণেই এই প্রজাতিটিকে বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বনাঞ্চলে বসবাসকারী ব্ল্যাক-বারড কুকরি স্নেক মূলত বনের মাটিতে বিচরণ করে।
নিশাচর এই সাপের জীবনাচরণ সম্পর্কে তথ্য এখনও খুবই সীমিত। ধারণা করা হয়, অন্যান্য কুকরি সাপের মতো এরাও ব্যাঙ, ছোট টিকটিকি, স্কিঙ্ক এবং সম্ভবত পোকামাকড় খায়।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও হংকংয়ে এই প্রজাতির সাপের উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।
তবে এটির অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন অধ্যাপক আহসান।
ছবির উৎস, Getty Images
পাইথন বিভিটাটাস বা অজগর
পাইথন বিভিটাটাসকে আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর আগে ২০০০ সালের মূল্যায়নে প্রজাতিটি ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল।
স্থানীয়ভাবে এটিকেই অজগর সাপ বলা হয়। কেউ কেউ বার্মিজ অজগরও বলে।
বাংলাদেশে মূলত উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এলাকায় বার্মিজ অজগর পাওয়া যায়। এর বাইরে এই সাপের বিস্তৃতি খুবই সীমিত।
আর্দ্র বন, ম্যানগ্রোভ, জলাভূমি, নদী-খাল ও তৃণভূমিতেও এরা বাস করতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মো. ফরিদ আহসান ও মো. আবু সাঈদের লেখা বই ‘বাংলাদেশের সাপ ও সর্পদংশন প্রতিরোধ ও চিকিৎসা’ সংক্রান্ত বইয়ে বার্মিজ অজগরের বর্ণনায় বলা আছে, এদেরকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের বনাঞ্চল ও তার আশেপাশের ঝোপজঙ্গল, চারণভূমি ও জলাশয়ে দেখা যায়।
আইইউসিএন-এর তথ্য অনুযায়ী, বার্মিজ অজগর দক্ষ সাঁতারু। তবে পানিতে স্বচ্ছন্দে চলাচলের পাশাপাশি গাছেও উঠতে পারে। স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখি এদের প্রধান খাবার।
বিশেষ করে, ইঁদুর, বাদুড়, শিয়াল, বাগডাস, হরিণ, বানর ,শূকর ও পাখি খায় এরা।
বার্মিজ পাইথন বিষধর না। কিন্তু এই সাপ একটি আস্ত মানুষকে গিলে ফেলতে পারে। এরাও শিকারকে লেজ দিয়ে ধরে অসাড় করে বা মেরে ফেলে, বলছিলেন অধ্যাপক আহসান।
বাংলাদেশে বার্মিজ অজগরের মোট সংখ্যা কত, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে তিনি মনে করেন যে বাংলাদেশে বার্মিজ অজগর এখনও একই অবস্থায় রয়েছে।
মূলত, মাংস ও চামড়ার জন্য এদেরকে অনেকসময় শিকার করা হয়। সেইসাথে, ধীরে ধীরে আবাসস্থল ধ্বংস হওয়াটাও এদের হারিয়ে যেতে বসার অন্যতম প্রধান কারণ।
ছবির উৎস, Getty Images
গ্রিন র্যাট স্নেক বা সবুজ দাঁড়াশ
পিটিয়াস নিগ্রোমার্জিনাটা বা গ্রিন র্যাট স্নেক, যা ব্ল্যাক-বর্ডার্ড র্যাট স্নেক নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে বিরল একটি সাপ। স্থানীয়ভাবে একে সবুজ দাঁড়াশ বা দারাজ সাপ নামে ডাকা হয়।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০০ সালের মূল্যায়নেও প্রজাতিটির সংরক্ষণ-অবস্থা একই ছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে এই প্রজাতির সাপ পাওয়া গেছে।
সাধারণত সমতল ও মাঝারি উচ্চতার উন্মুক্ত বনে এদের দেখা যায়। এছাড়া, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে আগের অবস্থায় নেই বা কিছুটা বদলে গেছে, এমন প্রাকৃতিক এলাকায়ও এরা থাকে।
যেমন– বন কাটা হয়েছে, বসতি বা রাস্তা হয়েছে, কৃষিকাজ হচ্ছে কিংবা অন্য কোনোভাবে বনের স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। মিশ্র চিরসবুজ বনেও এদের দেখা যায়।
সবুজ দাঁড়াশ সাপ মাটি ও গাছ, দুই জায়গাতেই চলাচল করতে পারে।
এরা প্রধানত দিনের বেলা সক্রিয় থাকে এবং এরা অবিষধর সাপ।
ব্যাঙ এদের প্রধান খাবার। এছাড়া, ছোট ইঁদুর, পাখি, টিকটিকি ও অন্যান্য সাপও খায় এরা।
বাংলাদেশে এই সাপের মোট সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
তবে বাংলাদেশে এর বিচরণক্ষেত্র খুবই সীমিত এবং আবাসস্থল মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় প্রজাতিটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এটিও ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাটাগরিতেই থাকবে বলে ধারণা অধ্যাপক আহসানের।
ছবির উৎস, Getty Images
হিমালয়ান কিলব্যাক বা কমলা-ঘাড় ঢোড়া
র্যাবডোফিস হিমালয়ানাসের ইংরেজি নাম হিমালয়ান কিলব্যাক বা অরেঞ্জ-কলার্ড কিলব্যাক।
বাংলাদেশে এটি ‘কমলা-ঘাড় ঢোড়া’ (কমলা রঙের ঘাড়যুক্ত) সাপ নামেও পরিচিত।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘ভালনারেবল’ ক্যাটাগরিতে আছে।
বাংলাদেশে এই সাপটি বিরল এবং খুব সীমিত এলাকায় পাওয়া যায়।
মূলত, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মিশ্র চিরসবুজ বনে এর উপস্থিতির তথ্য রয়েছে। আবাসস্থল কমে যাওয়ায় এই সাপের সংখ্যা কমছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে হিমালয়ান কিলব্যাক শুধু বনেই বাস করে না। কৃষিজমি, তৃণভূমি ও জলাভূমির পাশাপাশি নদী-নালা, পুকুর ও হ্রদের আশপাশেও এদের পাওয়া যেতে পারে।
এরা মাটি ও পানি দুই জায়গাতেই চলাচল করতে পারে এবং প্রধানত দিনের বেলা সক্রিয় থাকে।
ব্যাঙ, টিকটিকি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ বিভিন্ন প্রাণী এদের খাবার।
আইইউসিএনের নথিতে হিমালয়ান কিলব্যাককে ‘রিয়ার-ফ্যাংড’ ও ‘মাইল্ডলি ভেনোমাস’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এদের বিষদাঁত মুখের পেছনের দিকে এবং এটি মৃদু বিষধর।
অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, “এই সাপ কিছুটা বিষধর। শিকারকে ধরে যদি এরা কিছুক্ষণ চিবাতে পারে, তখন বিষটা লাগে। বিশ্বে র্যাবডোফিস হিমালয়ানাসের কামড়ে মারা যাওয়ার মাত্র একটি রেকর্ড। আর, বাংলাদেশে এদের অবস্থাও অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।”
ছবির উৎস, Getty Images
কিং কোবরা বা রাজগোখরা
ওফিওফ্যাগাস হান্নাহ, ইংরেজিতে যাকে বলে কিং কোবরা।
আর স্থানীয়ভাবে এর নাম রাজগোখরা, শঙ্খচূড় কিংবা হালা জামুরো (চাকমা)।
লন্ডনের ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে’র তথ্যমতে, কিং কোবরা হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম বিষধর সাপ। এরা সর্বোচ্চ ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে প্রজাতিটি ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল।
বাংলাদেশে মূলত চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও সুন্দরবনে রাজগোখরা পাওয়া যায়। সুন্দরবনে খুব বেশি না হলেও নিয়মিত এই সাপের দেখা মেলে।
অর্থাৎ, পাহাড়ি বন, ম্যানগ্রোভ ও চা-বাগানসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে এরা বাস করতে পারে। তবে সাধারণত এরা ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায় থাকতে পছন্দ করে।
আবাসস্থলভেদে কিং কোবরার গায়ের রঙে ভিন্নতা দেখা যায়। কোনোটি সাদা ডোরাসহ কালো, আবার কোনোটি ডোরাবিহীন বাদামি-ধূসর রঙের হয়ে থাকে।
তবে দেশে মোট কতটি রাজগোখরা রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। আইইউসিএনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আবাসস্থল ও খাবার কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে রাজগোখরার সংখ্যা কমছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, চীন, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ এশিয়ার অনেক দেশেই এদের বিচরণ রয়েছে।
রাজগোখরার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা নিজেদের বাসা তৈরি করে।
সেইসাথে, এরা দক্ষ সাঁতারু এবং গাছ, ঝোপঝাড়, এমনকি পাতার ওপরও এরা সময় কাটায়।
এছাড়া, এরা শীতনিদ্রায় যায় না এবং সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে। এদের প্রধান খাবার হলো অন্য সাপ এবং এই প্রজাতির সাপ অত্যন্ত বিষধর।
অন্যান্য সাপের তুলনায় বেশ দূর থেকেই যেকোনও জীবের উপস্থিতি টের পাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে কিং কোবরার। এমনকি, প্রায় ১০০ মিটার দূর থেকেও এরা শিকারের নড়াচড়া টের পায়। নিজের জন্য হুমকি মনে করলে কিং কোবরা আক্রমণ করে বসে।
আক্রমণের আগে এরা শরীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মাটি থেকে উপরে তোলে এবং ফণা তুলে ‘হিসহিস’ শব্দ করে। এভাবেই তেড়ে গিয়ে এরা শিকারের শরীরে পরপর কয়েকবার দংশন করে।
কিং কোবরার বিষে নিউরোটক্সিক রয়েছে। এটি শরীরকে ধীরে ধীরে অবশ করে ফেলে এবং মানুষ মারা যায়। প্রতিবার ছোবলে একটি কিং কোবরা যে পরিমাণ বিষ ঢেলে দেয়, সেটি একটি পূর্ণবয়স্ক হাতিকে কয়েক ঘণ্টায় এবং একজন মানুষকে মাত্র ১৫ মিনিটেই মেরে ফেলতে পারে।
অধ্যাপক আহসান বলেন, “এরা সহজে মানুষকে কামড়ায় না। তবে এদের বিষের পরিমাণ বেশি। বাংলাদেশে দু’টো রেকর্ড আছে মারা যাওয়ার। আমার জানামতে, ভারতে চারটি।”
তবে কিং কোবরার অবস্থা পরিবর্তনেরও কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না অধ্যাপক আহসান।
ছবির উৎস, Getty Images
পোপস পিট ভাইপার বা সবুজ বোড়া
ট্রাইমেরেসুরাস পোপিওরাম বা পোপস পিট ভাইপার, যা পোপস ট্রি ভাইপার বা পোপস ব্যাম্বু পিট ভাইপার নামেও পরিচিত। বাংলায় এর নাম সবুজ বোড়া বা টিয়া বোড়া।
আইইউসিএনের রেড লিস্টে এটিকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এই সাপের বিস্তৃতি খুবই সীমিত। বাংলাদেশে এদের মোট সংখ্যা কত কিংবা সংখ্যা বাড়ছে না কমছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে এর বিচরণক্ষেত্র খুবই ছোট।
বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা এবং সাঙ্গু নদীর কাছে এর উপস্থিতির তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
অধ্যাপক আহসান বলেন, “হিল ট্র্যাকসের বাইরে এটি আর যাবে না বলে আমার ধারণা। খুব বেশি হলে সিলেটে পাওয়া যেতে পারে।”
পোপস পিট ভাইপার মূলত বৃক্ষচারী। সাধারণত নিচু ঝোপঝাড়ে এদের দেখা যায়, কখনো কখনো জলাশয়ের কাছাকাছিও থাকে। তবে এটি বিষধর সাপ।
যদিও এদের কামড়ে বাংলাদেশে মারা যাওয়ার রেকর্ড নেই বলে জানান অধ্যাপক আহসান।
“এই সাপের কামড়ে এখন পর্যন্ত ২৬টার মতো রোগী পাওয়া গেছে। রোগী কষ্ট পায়, গ্যাংরিন হয়ে অনেক ক্ষতি হয়। কিন্তু কেউ মারা যায় নাই,” যোগ করেন তিনি।
পাশাপাশি, এই প্রজাতিটি নিশাচর এবং এরা সাপ ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে।
সবুজ বোড়া মূলত ওত পেতে শিকার করে। ব্যাঙ, টিকটিকি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী বা পাখি নাগালের মধ্যে এলে দ্রুত ছোবল দিয়ে বিষ প্রয়োগ করে।




