Source : BBC NEWS
Fabeha Monir/Bloomberg via Getty Images
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে শ্রমিকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে তৈরি পোশাক খাতে তৈরি হওয়া অস্থিরতার সাথে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
দেশে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রায়শই বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার খবর দেখা যায়। মূলত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা (বিএফআইইউ।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে, যাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা হিসাব জব্দ করা হয়, অনেক সময় তাদেরকে অবহিত করা হয় না। এমনকি কতদিন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে বা জব্দ করে রাখা হবে, সেটাও জানানো হয়না।
প্রশ্ন রয়েছে যে, সর্বোচ্চ কতদিন একটা অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে রাখা যায়? জব্দ হওয়া অ্যাকাউন্ট চালু হলে সেটি গ্রাহক কিভাবে জানতে পারবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটি গ্রাহককে অবহিত করে কি না?
অন্যদিকে কেউ যদি মনে করেন যে তার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা অন্যায় হয়েছে তাহলে কিভাবে প্রতিকার পেতে পারেন?
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং ব্যাংক ও আয়কর সংক্রান্ত আইনজীবীরা বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর, দুর্নীতি দমন কমিশন বা আদালতের নির্দেশে সাধারণত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে ব্যাংকগুলো।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের সময়েই রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার লোকজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার বহু উদাহরণ আছে।
Munir UZ ZAMAN / AFP via Getty Images
কোন আইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা -উত্তর এর ওয়েবসাইটে মোট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ তালিকায় ৫৫টি প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া আছে। এগুলোর কোনটির মন্তব্যের ঘরে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, কোনটি সাসপেন্ডেড বা বিন লকড লেখা আছে।
অর্থাৎ কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট জব্দ বা স্থগিত অবস্থায় আছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনীম ও সাবেক প্রথম সচিব ঈদতাজুল ইসলামের নামে থাকা ২৫টি ব্যাংক হিসাব গত মাসে ফ্রিজ করার আদেশ দিয়েছে আদালত।
আবার ২০২৫ সালের মার্চে ইসলামী ব্যাংকে এস আলম–সংশ্লিষ্ট (সাইফুল আলম) ২৪ প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক ও ব্যক্তিবিশেষের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) রাখতে আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।
সম্প্রতি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি ও বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ৮৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
এছাড়াও এ মুহূর্তে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার বহু মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ অবস্থায় আছে।
নতুন করে যাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাদেরও অধিকাংশই সাবেক মন্ত্রী, এমপি বা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
ওদিকে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের বিপরীতে আদালতের আদেশে ইতোমধ্যেই জব্দ (ফ্রিজ) বা ক্রোক করা (অ্যাটাচমেন্ট) ব্যাংক হিসাব থেকে সরকারের পাওনা শুল্ক ও কর আদায়ে করণীয় নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার।
অ্যাটর্নি জেনারেলকে এই কমিটির আহ্বায়ক করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে গত ১৪ই সেপ্টেম্বর।
Syed Mahamudur Rahman/NurPhoto via Getty Images
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অর্পিতা চৌধুরী বলছেন, বাংলাদেশে একাধিক আইনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসেব লেনদেন স্থগিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
আরেকজন আইনজীবী মুনীরুজ্জামান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথেও কাজ করেছেন। তিনি বলছেন, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা বা লেনদেন স্থগিত করার কাজটি করা হয় মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিএফআইইউর মাধ্যমে।
অন্যদিকে আয়কর আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলছেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার হচ্ছে বা সম্ভাবনা আছে দেখলে বিএফআইইউ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংককে যে কারও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশনা দিতে পারে।
আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইনের অধীনে প্রাথমিক মেয়াদ ৩০ দিনের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশ দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট। পরে সাত দফায় ত্রিশ দিন করে স্থগিতাদেশ বাড়ানো যায়।
এছাড়া আয়কর আইনে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে কোনো অ্যাকাউন্ট জব্দ রাখা যায়। এছাড়া কোড অফ সিভিল প্রসিডিউর বা দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ অনুযায়ী – কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি অর্থ আদায়ের মামলা থাকলে আদালত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যাংক হিসেব ক্রোক করতে পারে।
এছাড়া কাস্টমস অ্যাক্ট ২০২৩, ভ্যাট আইন ২০১২, বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালের আদেশ বা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে।
অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা যায়?
বাংলাদেশে সাংবাদিকসহ কয়েকটি পেশার কিছু ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব দীর্ঘসময় ধরে ফ্রিজ বা স্থগিত রাখার অভিযোগ উঠছে। এমনকি তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে এসব বিষয়ে কোনো তথ্য পাচ্ছেন না বলেও জানা গেছে।
“আমার অ্যাকাউন্ট কার নির্দেশে জব্দ হয়েছে সেটিও ব্যাংক আমাকে জানাতে রাজি হয়নি। কবে খুলবে তাও তারা জানে না বলে জানিয়েছে,” প্রায় দুবছর ধরে জব্দ হয়ে থাকা একটি অ্যাকাউন্টের একজন গ্রাহক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।
এ ধরনের ক্ষেত্রে ব্যাংক কী করে জানতে দুটি ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের জনসংযোগ বিভাগ থেকে শুধু বলা হয়েছে, “অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট আইন মোতাবেক পদক্ষেপ নিয়ে থাকে”। তারা তাদের নিজেদের নাম ও ব্যাংকের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।
আইনজীবী অর্পিতা চৌধুরী বলছেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই ব্যাংক হিসেবের ওপর অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায় না।
ফলে বিএফআইইউ এর নির্দেশে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে জানতে চাইতে পারেন কেন লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে।
“অর্থের বৈধ উৎস, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আয়কর রিটার্ন, ব্যবসায়িক দলিল ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ব্যাখ্যা দিতে পারেন। ভুল বা শনাক্তকরণ ভিত্তির অনুপস্থিতি অথবা নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রমের বিষয় তুলে ধরে ফ্রিজ প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিজ চৌধুরী।
আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের আদেশে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হলে মানি লন্ডারিং আইন ২০১২ এর অধীনে দুটি বিশেষ প্রতিকার আছে: এক্ষেত্রে আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনের বিধান আছে।
তবে আবেদনে প্রমাণ করতে হবে সম্পত্তিটি মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। সম্পত্তির ওপর আবেদনকারীর বৈধ মালিকানা বা স্বার্থ আছে।
Syed Mahamudur Rahman/NurPhoto via Getty Images
দ্বিতীয়ত, ফ্রিজ বা ক্রোক আদেশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারে।
এছাড়া আয়কর কর্তৃপক্ষের আদেশে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হলে ২০২৩ এর ২২৩ ধারা অনুযায়ী ওই আদেশের বিরুদ্ধে- সংশ্লিষ্ট আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে আদেশ প্রত্যাহার বা সংশোধনের আবেদন করতে পারে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয়ও নিতে পারে।
এছাড়া সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রিট আবেদন করতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী অর্পিতা চৌধুরী ।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সন্দেহভাজন কোনো ইনফরমেশন পেলে বিএফআইইউ চিঠি দিয়ে ব্যাংককে জানাবে ফ্রিজ করা হোক।
“এটা শুরুতে দিবে ৩০ দিনের জন্য। পরে আরও সাতবার করে বাড়াতে পারে। এরপরেও তাদের আরও ইনফরমেশন দরকার হলে তখন তারা আদালতের মাধ্যমে স্থগিতাদেশ নেয়। এটা তারা ব্যাংককে লিখিত ভাবে বলবে। ব্যাংকের দায়িত্ব হলো গ্রাহককে অবহিত করা। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যাংক সেটা করে না। কেবল লেনদেন করতে গেলে বলবে ফ্রিজ করা আছে। কারা ফ্রিজ করতে বলেছে সেটাও বলতে চায় না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
আইনজীবী মুনীরুজ্জামানও বলছেন, যে গ্রাহককে তার অ্যাকাউন্ট জব্দের বিষয়ে জানানোর দায়িত্ব হলো দুর্নীতি দমন কমিশন বা বিএফআইইউ’র।
“এখন বিশেষ কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট হলে হয়তো দুদক আগেই প্রেস ব্রিফিং করে জানায়। কিন্তু সাধারণত গ্রাহক লেনদেন করতে গিয়ে জানতে পারে যে তার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ আছে। আবার সচল হলেও সেটা লেনদেন করতে গিয়েই তারা বুঝতে পারে। গ্রাহককে খুব কম ক্ষেত্রেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।




