Home LATEST NEWS BANGLA আসাদের লুকিয়ে থাকা গোয়েন্দাপ্রধানের খোঁজ জানালো একটি ফোনবুক

আসাদের লুকিয়ে থাকা গোয়েন্দাপ্রধানের খোঁজ জানালো একটি ফোনবুক

5
0

Source : BBC NEWS

সবুজ রঙের একটি টেলিফোন, কালো দাগ দিয়ে কিছু তথ্য গোপন করা একটি ফোন নম্বরের বই এবং এর ওপর পরস্পর সংযুক্ত তিনটি লাল বৃত্তের নকশা করা ছবি। পাশাপাশি গাঢ় চুল ও ভ্রু ওয়ালা এক ব্যক্তির মাথার ছবি রয়েছে। যেখানে সিরিয়ার পতাকার লাল, সবুজ, কালো ও সাদা রঙের উপাদান দেখা যাচ্ছে।

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের একটি পরিত্যক্ত বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে সামরিক পোশাক পরা সশস্ত্র ব্যক্তিরা ডিজাইনার পোশাক ও নথিপত্র খুঁজে দেখছিলেন।

ঝলমলে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতির নিচে, বসার ঘরের মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে ছিল একই রোগা গড়নের একজন ব্যক্তির বিভিন্ন পরিবেশে তোলা ডজনখানেক ছবি। কোথাও তিনি ডেস্কে বসে আছেন, কোথাও আবার তুষারের মধ্যে খেলছেন।

এছাড়া একই ছবির একাধিক কপিও ছিল, যেখানে তাকে উষ্ণ হাসিমুখে ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক বাশার আল-আসাদের সঙ্গে করমর্দন করতে দেখা যায়।

ব্যক্তিটিকে প্রথম দেখায় চেনা না গেলেও, পাশে স্তূপ করে রাখা স্বর্ণপদক ও সোনালি সনদপত্রে হুসাম লুকা নামটি লেখা ছিল।

‘দ্য স্পাইডার’ নামে পরিচিত লুকা ছিলেন আসাদের অন্যতম শীর্ষ সহযোগী। তার বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও পদ্ধতিগত নির্যাতন পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে লুকা ছিলেন দেশের সবচেয়ে ভয়ের ব্যক্তিদের একজন।

তবে তার কাজের অধিকাংশই পরিচালিত হতো আড়াল থেকে।

শাসকগোষ্ঠীর অন্যদের মতোই, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর লুকাও যেন রাতারাতি উধাও হয়ে যান। তার পেছনে থেকে যায় অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্ন এবং ন্যায়বিচারের দাবি, যা কোনোদিন বাস্তবায়িত নাও হতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।

আসাদের পতনের কয়েকদিন পর তার অ্যাপার্টমেন্টে আমরা বিদ্রোহীদের দেখেছিলাম, যারা তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো সূত্র খুঁজছিল।

একটি ঝাড়বাতি এবং বিভিন্ন ধরনের বাসনকোসন ও কাটলারি, যা হুসাম লুকার অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের সামগ্রীর অংশ

আবার দামেস্কের সেই বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের ঘটনায় ফিরে যাই। সেখানে বসার ঘরের এক কোণে একটি কনসোল টেবিলের ওপর ছিল সাধারণ চেহারার একটি নোটবই।

ভেতরে নীল কালিতে হাতের লেখায় আমরা কয়েক ডজন নাম খুঁজে পাই। সেখানে দোকানদার, চিকিৎসক, সামরিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে লুকা পরিবারের পদবি বহনকারী ব্যক্তিদের নামও ছিল।

এই যোগাযোগগুলো কি ‘দ্য স্পাইডার’ সম্পর্কে আরও জানতে সহায়তা করতে পারে? বা তার অপরাধ সম্পর্কে? এমনকি তাকে খুঁজে বের করতেও সহায়তা করতে পারে?

দেয়ালে লেখা ফোন নম্বর

একসময় লুকার নিজের ফোন নম্বর না জানাটাই কঠিন ছিল। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় শহর হোমসের দেয়ালজুড়ে সেটি স্প্রে পেইন্টে লেখা ছিল।

২০১১ সালে গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকে আসাদের নির্মম দমনের মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। পরবর্তী যুদ্ধটিতে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হন।

তখন লুকা ছিলেন পলিটিক্যাল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের স্থানীয় প্রধান। এটি ছিল আসাদের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি। বিদ্রোহীদের কাছ থেকে শহরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল।

সেসময় হোমসের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো সরকারি অবরোধে ছিল এবং বাসিন্দারা খাদ্য ও ওষুধ সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছিলেন।

সাবেক বিদ্রোহী যোদ্ধা মোতাজ আল-জায়েদিসহ কয়েকজন আমাদের বলেন, তারা বেঁচে থাকার জন্য ইঁদুর পর্যন্ত খেয়েছিলেন।

হুসাম লুকা ও আসাদের করমর্দনের একটি ছবি। দুজনেই গাঢ় রঙের স্যুট পরা এবং হাস্যোজ্জ্বল। তাদের মার্বেলের মতো দেয়াল ও মেঝেওয়ালা একটি কক্ষে দেখা যাচ্ছে

আল-জায়েদি মনে করে করে বলছিলেন, তার এলাকায় একটি দেয়ালে লুকার নাম ও ফোন নম্বর লেখা ছিল। কথাটি ছড়িয়ে পড়ে যে, যারা যুদ্ধ এলাকা ছাড়তে চান তারা নিরাপদে বের হওয়ার জন্য ওই নম্বরে ফোন করতে পারবেন।

ধারণা করা হয়, কিছু মানুষকে লুকা নিরাপদে শহর ছাড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে আমাদের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজনের দাবি, যাদের মধ্যে আল-জায়েদিও রয়েছেন, যারা ওই নম্বরে ফোন করেছিলেন তাদের মধ্যে অনেকে এরপর আর কখনও দেখা দেননি কিংবা তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অনেকেই বলেন, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভেতরেও তার তথ্যদাতা ও সহযোগীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকায় তারা লুকাকে ‘দ্য স্পাইডার’ বলে ডাকতেন।

হোমসের বাসিন্দারা আমাদের বলেন, “সে ছিল সর্বত্র”।

আল-জায়েদি তাকে ‘অশুভ প্রতিভা’ এবং ‘চতুর শিয়াল’ বলে বর্ণনা করেন।

তবে শহরে তার সবচেয়ে গুরুতর কর্মকাণ্ড ছিল তথাকথিত ‘ঈদ গণহত্যা’-য় তার জড়িত থাকার অভিযোগ, যেটাকে কেউ কেউ ‘শিশু গণহত্যা’ নামেও অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময়ও এই ঘটনার উল্লেখ করেছিল।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঈদুল আজহার সময়, মোহাম্মদ তাওয়াকাতলির সাত বছর বয়সী ছেলে ওয়ায়েল আল-ওয়ায়ের এলাকায় তার তৈরি করা খেলার মাঠে বাগান করছিল।

বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে, রেশনিং ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর, হামলার ঘটনাটি শুরু হওয়ার কথা স্মরণ করেন মোহাম্মদ।

এ বছরের শুরুতে পার্কটিতে ঘুরে বেড়ানোর সময়, যেখানে এখন সারি সারি চারা গাছ লাগানো হয়েছে, তিনি নিহত শিশুদের নাম স্মরণ করছিলেন এবং তারা তখন কী খেলা খেলছিল তা বলছিলেন। তিনি সেসব জায়গাও দেখান যেখানে তিনি তাদের মরদেহ পেয়েছিলেন, যার মধ্যে ওয়ায়েলের মরদেহও ছিল।

ডোরাকাটা ধূসর কলারওয়ালা পোশাক পরা মোহাম্মদ আরবি লেখা সম্বলিত সাদা-কালো কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। পাশে লাল ফুল লাগানো রয়েছে

“ওরা ছিল ছোট ছোট শিশু,” চোখে পানি নিয়ে বলেন তিনি, “এই মাটি রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল।”

সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ২৮ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১৭টি শিশু ও চার নারী ছিলেন।

একটি সিরীয় কর্মী সংগঠন এবং সে সময়ের একটি বিরোধীপন্থি পত্রিকার মতে, ওই দিনের হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে লুকা দায়ী ছিলেন।

হোমসে তার কর্মকাণ্ড তাকে পদোন্নতি এনে দেয়। শাসনব্যবস্থা পতনের সময় তিনি জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট (জিএসডি) গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন, যা তাকে দেশের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি বানায়।

সরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ওই সময় বিরোধী যোদ্ধা, সাংবাদিক, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা আসাদ সরকারের বিরোধী বলে সন্দেহভাজন যে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারত।

গ্রেফতার ব্যক্তিদের দামেস্কের সেদনায়াসহ রাজনৈতিক কারাগারগুলোতে রাখা হতো। সেদনায়া এতটাই কুখ্যাত ছিল যে ওই কারাগারকে ‘মানব কসাইখানা’ বলা হতো। সেখানে বন্দি হওয়া অনেককে আর কখনও দেখা যায়নি।

জিএসডি প্রধান হিসেবে সিরিয়ার আটকনীতির ওপর লুকার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং তার অধীনস্থরা সেদনায়া কারাগারের সঙ্গে সব যোগাযোগ নজরদারি করতেন।

সামাজিক মাধ্যমে সিরিয়ার বিভিন্ন অংশে সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি ব্যাপকভাবে উঠেছে।

অনেকে মনে করেন, নতুন সিরীয় সরকার তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে যথেষ্ট করছে না।

সিরিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আল-তুরবা বিবিসিকে জানান, সরকার লুকার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তার বিরুদ্ধে “পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, নির্যাতন এবং নির্যাতনের ফলে মৃত্যুর” অভিযোগ আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, “দেশের ভেতরে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সেটি জারি করার কাজ চলছে।”

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন লুকা এবং নিখোঁজ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ শাসনকর্মকর্তার অবস্থান অনুসন্ধান ও প্রত্যর্পণ চাওয়ার কাজ করছে।

ছেলের শোকে এখনো কাতর মোহাম্মদ বিবিসিকে বলেন, তিনি চান লুকাসহ শাসনব্যবস্থার অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সিরিয়ায় ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক।

তিনি বলছিলেন, “তাদের দেখতে মানুষের মতো, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো মানবতা নেই।”

সন্ধান অভিযান

লুকার অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া নোটবইয়ের প্রতিটি পাতার ছবি আমরা তুলেছিলাম। পরে লন্ডনে ফিরে ১৫৫টি ফোন নম্বরের প্রতিটিই পরীক্ষা করা শুরু করি।

এর মধ্যে ৫১টি নম্বর সচল বলে মনে হয়েছে।

এরপর তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হওয়া ব্যক্তিদের দিয়ে শুরু করে আমরা এসব নম্বরে আবার ফোন করি। কোনো কলই সফল হয়নি।

যারা ফোন ধরেছিলেন, তারা আমরা কারা এবং কেন ফোন করেছি শুনেই কল কেটে দেন। কেউ লুকা বা তার পরিবারকে চেনেন না বলে দাবি করেন, আবার কেউ নোটবইয়ে থাকা ব্যক্তিই নন বলে জানান।

খোলা ফোনবুকের একটি পৃষ্ঠা। বাম পাশে আরবি বর্ণমালার ট্যাব এবং ওপরে নাম ও ফোন নম্বরের কলাম রয়েছে

এরপর বিবিসির একজন প্রতিবেদক সরাসরি সিরিয়ায় যান, যার নামই এক সময় লুকা দায়িত্বে থাকাকালে জিএসডির ওয়ান্টেড তালিকায় ছিল।

ফোনবইয়ে তালিকাভুক্ত অনেকেই চিকিৎসক ছিলেন। তাই তাদের কারও কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি চিকিৎসার পরামর্শের কথা বলে সময় নেন।

আলেপ্পোর একজন চিকিৎসক অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করেন যে তিনি লুকার চিকিৎসা করেছিলেন। তবে তিনি বিবিসির সাংবাদিককে বেরিয়ে যেতে বলেন এবং পরামর্শ ফিও ফেরত দেন।

দামেস্কের আরেকজন চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতে জানা যায়, তিনি একসময় লুকার মায়ের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য রাশিয়া সফর করেছিলেন। তবে তিনি আর কোনো তথ্য দিতে চাননি। শুধু লুকার এক মেয়ের মালিকানাধীন একটি ফার্মেসির দিকে ইঙ্গিত করেন।

স্থানীয়দের মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর তাকেও আর দেখা যায়নি।

মাসের পর মাস অনুসন্ধান করেও আমরা কোনো অগ্রগতি পাইনি।

তারপর আসে প্রথম সাফল্য।

ওপর থেকে তোলা ছবিতে সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত সেদনায়া কারাগারের ছবি। অনেক দূরে কতগুলো পাহাড়ের সারি

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

নোটবইয়ে থাকা একজন, যাকে আমরা আবার ফোন করেছিলাম, অবশেষে সাড়া দেন।

তিনি নিজেকে লুকার অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিরাপত্তারক্ষী বলে পরিচয় দেন। পরে তিনি আমাদের এমন একজনের নম্বর দেন, যাকে তিনি লুকার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বলে বর্ণনা করেন। আমরা তাকে মাহমুদ নামে উল্লেখ করছি।

মাহমুদের সাক্ষাৎকার পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়।

বৈঠকের সময় ঠিক হলেও তিনি আসতেন না, অথবা ব্যক্তিগত জায়গায় দেখা করার প্রস্তাব দিতেন যেটাকে আমাদের প্রতিবেদক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন।

অবশেষে এক রাতে মধ্যরাতের ঠিক আগে একটি হোটেলে তাদের দেখা হয়।

প্রশস্ত কাঁধের ও প্রভাবশালী উপস্থিতিসম্পন্ন মাহমুদ যেন প্রতিটি উত্তরের আগে খুব সতর্কভাবে চিন্তা করছিলেন।

তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থা পতনের সময় তাকে ফেলে চলে যাওয়ায় তিনি লুকার ওপর ক্ষুব্ধ।

মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীরা রাজধানীর দিকে অগ্রসর হওয়ায় আসাদের শাসন পতনের মুখে বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন লুকা বলেছিলেন, তিনি দামেস্কেই থেকে শহর রক্ষা করবেন।

কিন্তু পরদিন ভোরের আগেই তিনি হারিয়ে যান। যাওয়ার সময় অফিসের সিন্দুক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থও নিয়ে যান বলে দাবি করেন মাহমুদ।

লুকা বা তার পরিবারের যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান মাহমুদ।

তবে তিনি লুকার গাড়িচালকের নম্বর দেন। তার বিশ্বাস, সেদিন রাতেই ওই চালক তাকে রাজধানী থেকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা আরও কঠিন ছিল। ফোন ধরলে তার কণ্ঠস্বর উদ্বিগ্ন ও কাঁপা শোনাত। তিনি বারবার বলেন, তিনি কেবল একজন চালক এবং লুকার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানেন না।

আমাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার পর তিনি শেষ পর্যন্ত আর কোনো জবাব দেওয়া বন্ধ করে দেন।

এরপর আমরা লুকার সম্ভাব্য পালানোর পথগুলো অনুসন্ধান করি।

এর মধ্যে ছিল প্রতিবেশী লেবাননও, যেখানে ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর সঙ্গে আসাদ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

লেবানন সরকারের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র আমাদের জানায়, তার ধারণা লুকা “ভালো মানের রুশ পাসপোর্টে, কিন্তু অন্য নামে” লেবানন হয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন।

আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে খুঁজে পাই, যিনি এখন লেবাননে আছেন এবং যার নাম লুকার যোগাযোগ তালিকায় ছিল।

নতুন সিরীয় সরকার যাদের খুঁজছে, তিনি তাদেরই একজন, কারণ আসাদ সরকারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়, এমন ওই ব্যক্তি বলেন, তার কাছে লুকার একটি নম্বর আছে।

নম্বরটি দেখে আমরা বুঝতে পারি সেটিতে রাশিয়ার কান্ট্রি কোড ব্যবহার করা হয়েছে।

আসাদ সরকারের অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিল রাশিয়া।

আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নিজেই নিশ্চিত করেছিলেন যে তিনি সেখানে পালিয়ে গেছেন।

তার ঘনিষ্ঠ অনেক সহযোগীও সেখানে গেছেন বলে ধারণা করা হয়।

দামেস্কে লুকার অ্যাপার্টমেন্টে আমরা আরও কিছু সূত্র পেয়েছিলাম, যা মস্কোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।

সেখানে রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া পুরস্কার ছিল। এমনকি রুশ জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তার পাঠানো নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ডও ছিল।

এবার তার রুশ ফোন নম্বর আমাদের ধারণাকে আরও জোরালো করে, যে তিনি প্রকৃতপক্ষে রাশিয়াতেই আছেন।

সাত বছর বয়সী ওয়ায়েলের একটি ছবি। তার পরনে বাদামি জাম্পার ও নীল জিনস, হাতে একটি লাল ফুল

সেই ফোন কল

আমরা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম যে নম্বরটি সত্যিই লুকার।

কয়েকদিন পর, আমাদের উপস্থিতিতে ওই ব্যক্তি (যিনি ফোন নম্বরটি দিয়েছিলেন) ফোন স্পিকারে রেখে যাকে তিনি হুসাম লুকা বলছিলেন তাকে কল করেন।

আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর কেবল লুকাই জানার কথা।

ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠস্বর বিভ্রান্ত শোনালেও প্রশ্নগুলোর উত্তর সঙ্গে সঙ্গে এবং সঠিকভাবে দেন।

তবে তিনি সরাসরি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

পরে আমাদের ওই যোগাযোগ আবার ফোন করতে রাজি হন এবং আমাদের তাকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ দেন।

একই কণ্ঠস্বর ফোন ধরে।

আমরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে সাবেক এই কর্মকর্তা সম্পর্কে গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই বলে জানাই।

লুকা বলেন, “আমি যে অবস্থায় আছি, তাতে ফোনে কথা বলে কোনো ঝুঁকি নিতে পারি না।”

তার কণ্ঠে উদ্বেগ ছিল।

রাশিয়া কি তাকে কথা বলতে বাধা দিচ্ছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি কথা বলতে পারি না। ব্যাখ্যা করতে পারি না। আপনাকে বুঝতে হবে।”

রাশিয়ার বাইরে দেখা করার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলেন, “এটা কঠিন।”

এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।

পরে আমরা আরেকটি নম্বর পাই, যেটিও লুকার বলে আমাদের জানানো হয়।

এবার সেটি সিরিয়ায় নিবন্ধিত ছিল এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ ও বার্তাপ্রেরণ অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যেগুলো তিনি এখনো ব্যবহার করছেন বলে মনে হয়।

একদিনের মধ্যে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর উপকণ্ঠের দুটি আবাসিক এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় বিবিসি।

রাশিয়ায় নির্বাসিত অবস্থায় বাশার আল-আসাদ যেরকম বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলে ধারণা করা হয়, তার থেকে অনেক ভিন্নরকম বলে মনে হয়েছে এই স্থানগুলোকে। একই সঙ্গে তা সিরিয়ায় লুকার অতীত জীবনের সঙ্গেও বেমানান।

আমরা জানতাম, রাশিয়ায় ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে আসাদ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও পুলিশের নাগালের বাইরে সুরক্ষিত থাকেন।

তাই আমরা আবারও ফোনে তার কাছে অভিযোগগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার সিদ্ধান্ত নিই।

আমরা নম্বরে ফোন করি।

আগের সেই একই কণ্ঠস্বর ফোন ধরে। তিনি জানতে চান কে ফোন করেছে।

বিবিসি বলা মাত্রই তিনি ফোন কেটে দেন।

আমরা হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন অভিযোগের জবাব চাই। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেননি।

লুকা যে মস্কোতে আছেন, এই তথ্য সিরিয়ায় ন্যায়বিচার প্রত্যাশীদের জন্য হতাশাজনক।

রাশিয়া দীর্ঘদিন যে সরকারকে সমর্থন করেছে, সেই সরকারের কর্মকর্তাদের প্রত্যর্পণ করার সম্ভাবনা খুবই কম।

লুকার উপস্থিতি সম্পর্কে এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ অনুরোধ বিবেচনা করবে কি না, সে বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নেরও কোনো জবাব দেয়নি রুশ সরকার।

হোমসে ফিরে মোহাম্মদ বলেন, তিনি আশা ছাড়বেন না যে একদিন লুকা এবং আসাদ সরকারের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সদস্য ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হবেন।

তিনি বলেন, “ওই শাসনব্যবস্থা এবং এর নিরাপত্তা যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত সবার ওপরই আমার রাগ… তারা সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ছিল।”

“ওয়ায়েল ছিল মাত্র সাত বছরের একটি শিশু, তার সব চিন্তা ছিল খেলাধুলা আর আনন্দ করা।”

প্রতিবেদন তৈরিতে আরো সহায়তা করেছে রিয়াম দালাতি, ঘাইত সোল ও আবিগাইল আকেরমান।