Source : BBC NEWS

ঈদুল আযহার গরু

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

প্রত ি বছর ঈদুল আযহ া ব া কোরবানির ঈদ ে বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ গরু, ছাগল, মহিষসহ বিভিন্ন ধরনের পশ ু কোরবান ি দিয় ে থাকেন । ঈদের দিন সকাল ে কোরবানির পশ ু জবাইয়ের পর মাংস কাটাসহ সেগুল ো ভাগ এব ং বণ্টন কর ে থাকেন কোরবান ি দাতারা।

এই কোরবানির মাংস বণ্টন কর া নিয়েও নান া ধরনের মতবাদ প্রচলিত রয়েছ ে বাংলাদেশে । কেউ কেউ বল ে থাকেন কোরবানির পশুর মাংস তিনট ি ভাগ ে ভাগ কর া উচিত।

তাদের ব্যাখ্য এই মাংসের একভাগ কোরবানি-দাত া নিজ ে রাখবেন, একভাগ আত্নীয় স্বজনক ে দিবেন এব ং বাক ি একভাগ গরীব ব া মিসকিনদের মাঝ ে বণ্টন করবেন।

কোরবানির মাংসের তিন ভাগ নিয় ে এই আলোচন া বহ ু পুরনো । আলেম সমাজের প্রতিনিধির া বলছেন, কোরবানির মাংসের তিনভাগ বণ্টন কোরআন হাদিস দ্বার া সমর্থিত । তবে, এট ি কোনভাবেই বাধ্যতামূলক নয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফত ি আনিসুর রহমান সিকদার বলছেন, কোরবানির মাংস কেউ যদ ি চায় স ে পুরোটাই নিজ ে খেত ে পার ে আবার চাইল ে সবটুক ু দান কর ে দিত ে পারে।

সাধারণত গরু-মহিষের মত ো বড় পশুর ক্ষেত্র ে অনেকেই সর্বোচ্চ সাত ভাগ ে কোরবান ি দিয় ে থাকেন।

তবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্র ে একট ি নিয়ম প্রচলিত রয়েছে । গ্রাম ে গঞ্জ ে পশ ু কোরবানির পর ‘ সামাজিক ভাগ ‘ নাম ে একট ি ভাগ কর ে রাখেন অনেকে।

এই রীত ি অনুযায়ী, সামর্থ্যবানর া তাদের কোরবানির মাংসের একট া নির্দিষ্ট অংশ সমাজের কল্যাণ তহবিল ব া অভাব ী মানুষের জন্য দান করেন।

তব ে মুফত ি ও আলেম সমাজের প্রতিনিধির া বলছেন- কোরবানির মাংসের এই ধরনের ভাগ কোনভাবেই বাধ্যতামূলক কর া যাব ে না।

কোরবানির পর মাংস কাটাকাটিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে

ছবির উৎস, Md. Akhlas Uddin/Pacific Press/LightRocket via Getty Images

তিন ভাগের ধারণ া এলে া যেভাবে

ধর্মগ্রন্থ কোরআন ে বল া আছে, কোরবানির পশুর রক্ত আল্লাহর কাছ ে পৌঁছায় না, এর গোশতও না, বর ং তাঁর কাছ ে য া পৌঁছায়, ত া হল ো তোমাদের তাকওয় া ব া ধর্মনিষ্ঠা।

য ে কারণ ে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্য া দিয় ে ধর্মীয় পন্ডিতগন বলছেন, মূলত আল্লাহর সন্তুষ্ট ি অর্জনের জন্যই পশ ু কোরবান ি দেওয় া সামর্থবান মানুষের জন্য ওয়াজিব ব া বাধ্যতামূলক।

কোরবান ি দেওয় া অবশ্য পালনীয় ইবাদত এট ি কোরআন ও হাদিস দ্বার া স্বীকৃত । তব ে কোরবানির মাংস বণ্টন নিয় ে আমাদের সমাজ ে নান া ধরনের মতবাদ বহ ু পুরনো।

কোরবানির মাংস প্রসঙ্গ ে ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সুর া হজ ে বল া হয়েছে, তোমর া ত া থেক ে ( কোরবানির মাংস ) থেক ে খাও এব ং মানুষদের খাওয়াও, মানুষের কাছ ে হাত পাত ে ন া এমন অভাবীদের এব ং চেয় ে বেড়ায় এমন অভাবীদের।

ধর্মীয় গবেষক ও আলেমর া বলছেন, ইসলামের নব ী মুহাম্মদ কোরবানির মাংস এক ভাগ নিজের পরিবারক ে খাওয়াতেন । এক ভাগ গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন আর এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের দিতেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফত ি আনিসুর রহমান সিকদার বিবিস ি বাংলাক ে বলেন,” কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গ া ভাগ ব া বণ্টনের ক্ষেত্র ে তিনভাগের বিষয়ট ি এসেছে । এব ং ভাগের ক্ষেত্র ে তিনভাগ করার বিষয় ে উৎসাহ দেওয় া হয়েছ ে”।

তার মতে, এক্ষেত্র ে শুধ ু কোরবানির পশুর মাংস নয় ইসলামের বিধান অনুযায়ী, অন্য অনেক কিছুতেই তিনভাগের বিষয়ট ি এসেছে।

ইসলাম ি লেখক ও গবেষক শরীফ মুহাম্মদ বিবিস ি বাংলাক ে বলছিলেন,” ইসলাম ধর্মের য ে বড় দুইট ি উৎসব রয়েছ ে এই দুইট ি উৎসবেই গরীবদের খুশ ি করার উপলক্ষ রয়েছে । সেট ি যেমন ঈদুল ফিতর ে রয়েছে, তেমন ি ঈদুল আযহায়ও রয়েছ ে”।

” রোজার ঈদ ে গরীবদের ফিতর া দেয় । আর কোরবানির ঈদ ে মাংসও বিতরণ কর া হয় । তব ে ফিতর া যেমন সচ্ছল মানুষের ক্ষেত্র ে ন া দিল ে গুনাহ হব ে তব ে কোরবানির মাংসের ক্ষেত্র ে বিষয়ট ি এমন ন া”, যোগ করেন তিনি।

অর্থাৎ ধর্মীয় স্কলারদের মতে, কোরবানির ঈদ ে গরীবদের উৎসব ে সামিল করার একট ি উপলক্ষ কোরবানির মাংস বিতরণ।

প্রতি বছর কোরবানিরঈদ উপলক্ষে সারাদেশে বসে অসংখ্য পশুর হাট

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

মাংসের তিনভাগ ক ী বাধ্যতামূলক?

কোরবানির দিন মাংস কাটার সময়ও অনেক সময় গরীব কিংব া ভিক্ষুকদের পক্ষ থেক ে মাংস সংগ্রহ করত ে আসত ে দেখ া যায় । মাংস ভাগ ব া বণ্টনের আগ ে অনেকেই গরীবদের মাংস দিয়েও থাকেন।

ধর্মীয় গবেষক ও মুফতির া কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্য া দিয় ে বলছেন, কোরবানির মাংস তিন ভাগ কর ে এক অংশ সদক া করা, এক অংশ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও দরিদ্র প্রতিবেশীদের দেওয় া আর এক অংশ নিজের জন্য রাখ া মুস্তাহাব ব া উত্তম।

তবে, এট া কোন ো জরুর ি ব া আবশ্যক আমল নয় । য ে কারণ ে মাংসের তিনভাগ করাক ে তার া বাধ্যতামূলক মন ে করেন না।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক আনিসুজ্জামান সিকদার বলছিলেন,” তিনভাগ কর া কোরআন হাদিস সমর্থিত । তব ে কোরবানির মাংস তিনভাগের একভাগ বণ্টনের ক্ষেত্র ে এমন কোন রেওয়াত নাই য ে এট া করতেই হব ে” ।

” তিনভাগ হাদিস কোরবান দ্বার া সমর্থিত, তব ে এটাক ে ইসলামের কোথাও বাধ্যতামূলক কর া হয়নি, এট া জরুর ি ন া”, যোগ করেন তিনি।

ইসলামিক গবেষকর া বলেছেন, ইসলামের নব ী মুহাম্মদ এব ং তার অনুসার ী ব া সাহাবার া কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্র ে তিনট ি ভাগ করেছেন।

লেখক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন,” কোরবানির মাংসের তিনভাগের ক্ষেত্র ে সামাজিক গুরুত্ব অনেক, তব ে এবাদতগত স্তর বিন্যাস ে ফরজ, ওয়াজিব ব া সুন্নত ে মোয়াক্কাদ া ধরনের আমল ন া” ।

য ে কারণ ে কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্র ে তিনভাগের বিষয়টিক ে অবশ্যই পালনীয় ব া বাধ্যতামূলক হিসেব ে দেখছেন ন া তারা।

মুফত ি সিকদার বিবিস ি বাংলাক ে বলছিলেন,” মাংসের তিনভাগ হাদিস কোরবান দ্বার া সমর্থিত হলেও বাধ্যতামূলক না । কেউ যদ ি চায় সবটুক ু মাংস নিজেই খেত ে পারবে । আর কেউ যদ ি চায় পুরোট া দানও কর ে দিত ে পারব ে”।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোরবানির পশু জবাইয়ের পর মাংস ভাগ-বন্টন চলছে

Mohammed Kasim/Majority World/ Universal Images Group via Getty Images

কোরবানিত ে সামাজিক ভাগ কী?

ধর্মীয ় রীত ি অনুযায়ী, মানুষ কোরবানির পশুর মাংসের একট া অংশ দরিদ্রদের মধ্য ে বিলিয় ে দিয় ে থাকেন । য ে কারণ ে প্রত ি কোরবানির ঈদেই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের বহ ু মানুষক ে দেখ া যায ় বাড় ি বাড় ি ঘুর ে মাংস সংগ্রহ করেন।

তবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন ো সমাজের সবাই মিল ে এক সাথ ে কোরবান ি করার নিয়ম চাল ু আছে । ওইসব এলাকায় যার া কোরবান ি করে, তাদের প্রত্যেককেই বাধ্যতামূলকভাব ে কোরবানির একট ি অংশ ‘ সামাজিক ভাগ ‘ হিসেব ে দিত ে হয় এব ং ত া দরিদ্র ও অভাবীদের মধ্য ে বণ্টন কর া হয়।

ধর্মীয় লেখক ও গবেষকর া বলছেন, সমাজের ভাগ নাম ে কোথাও কোথাও কোরবানি-দাত া সবার কাছ থেক ে মাংস গ্রহণ কর ে থাকে । যিন ি সেই ভাগ ে মাংস দিবেন তার যদ ি আপত্ত ি ন া থাক ে তাহল ে এভাব ে গরীবদের মাঝ ে মাংস বণ্টন কর া যেত ে পারে।

লেখক ও গবেষক শরীফ মুহাম্মদ বিবিস ি বাংলাক ে বলেন,” গ্রাম ে একট া ভাগ বাধ্যতামূলকভাব ে তুল ে নেওয় া হয় । এক ভাগ দিতেই হব ে এট া যদ ি বাধ্যতামূলকভাব ে আরোপিত কর া হয় তাহল ে এট া জায়েজ নাই”।

উদাহরণ দিয় ে তিন ি বলেন,” ধরেন যদ ি গ্রামের মোড়ল ব া মাতব্বর সবার ওপর পাঁচ কেজ ি ব া ১০ মাংস দিতেই হব ে বল ে চাপিয় ে দেয় তাহল ে এট া হব ে আরোপিত । এট ি কোনভাবেই ইসলাম সমর্থন কর ে না । যদ ি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাব ে দেন তাহল ে কোন সমস্য া নেই” ।

সামাজিক ভাগ নাম ে যদ ি সমাজের সত্যিকারের গরীবদের মাংসের ভাগ দেওয় া যায়, তাত ে যদ ি কোরবান ি দাতাদের মাঝ ে কোন আপত্ত ি ন া থাক ে তাহল ে সেটিক ে ইতিবাচক হিসেব ে দেখেন ধর্মীয় গবেষকরা।