Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Kazi Salahuddin Razu/NurPhoto via Getty Images
ইসলাম ধর্মমতে, সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে কোরবানি করার রীতি চালু হয়েছিল মানব সভ্যতার একেবারে শুরুতে নবী আদমের জীবদ্দশাতেই। তবে বর্তমানে পশু কোরবানি যে রীতি মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, সেটির সঙ্গে নবী ইব্রাহীমের ইতিহাসই বিশেষভাবে জড়িত বলে জানান ইসলামি চিন্তাবিদরা।
মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে নবী ইব্রাহীম তার শিশুপুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করতে মক্কায় অবস্থিত আরাফাতের ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ইব্রাহীমের বিশ্বাস ও আনুগত্যে সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট হন এবং ইসমাইলের পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি হয়।
সেই ঘটনা স্মরণের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর জিলহজ মাসের দশ তারিখে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বে ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়।
যদিও প্রাক-ইসলামি যুগেও আরবে পশু কোরবানির রীতি চালু ছিল।
“কিন্তু তখন পশু কোরবানি করা হতো দেব-দেবীকে উদ্দেশ্য করে। ফলে হযরত মুহাম্মদ (সা.) সেসময় মক্কায় অবস্থান করলেও কোরবানির ওই রীতি অনুসরণ করেননি। এমনকি, নবুয়ত প্রাপ্তির পরেও অনেক বছর তাকে কোরবানি দিতে দেখা যায়নি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান মিয়াজী।
পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারের একপর্যায়ে ইসলামের নবী মুহাম্মদ মদিনায় হিজরত করেন এবং সেখানেই প্রথমবার পশু কোরবানি করেন।
ইসলামি শরিয়তে গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, দুম্বা এবং উট- এই ছয় ধরনের পশু কোরবানি বৈধ করা হয়েছে।
এগুলোর মধ্য থেকে নিজের প্রথম কোরবানিতে ইসলামের নবী ঠিক কোন পশুটিকে বেছে নিয়েছিলেন?
ছবির উৎস, Getty Images
ঈদুল আযহার প্রবর্তন
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, ৬১০ খ্রিস্টাব্দে নবুয়ত প্রাপ্তির পর ইসলামের নবী প্রায় এক যুগ ধরে মক্কাবাসীর কাছে ইসলাম প্রচার করেন।
এই কাজ করতে গিয়ে নানান অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করার পাশাপাশি একাধিকবার হত্যার ষড়যন্ত্রের মুখেও পড়তে হয়।
নির্যাতন ও হুমকির মাত্রা বাড়তে থাকার একপর্যায়ে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা ছেড়ে মদিনায় পাড়ি জমান ইসলামের নবী। ইসলামের ইতিহাসে এই ঘটনাটিকে ‘হিজরত’ (এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া) বলে চিহ্নিত করা হয়।
ওই সময় থেকেই মুসলমানরা নতুন করে সাল গণনা শুরু করেন, যা ‘হিজরি সাল’ নামে পরিচিতি পায়।
আনাস ইবনে মালিক নামে নবীর এক সাহাবী বা সাথীর বর্ণনার থেকে জানা যায়, মদিনায় যাওয়ার পর ইসলামের নবী জানতে পারেন সেখানকার বাসিন্দারা ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ নামে প্রতিবছর দু’টি বড় উৎসব পালন করে থাকেন।
এর মধ্যে একটি উৎসব শরতে এবং অন্যটি বসন্তকালে উদযাপিত হতো বলে বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
“তখন ওই দু’টি উৎসবের আদলে মুসলমানদের জন্য দু’টি বড় ধর্মীয়, সামাজিক এবং জাতীয় উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করা হয়,” বলেন অধ্যাপক মিয়াজী।
“এর একটি উৎসব আরবি শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে উদযাপন করা হয়, যা ঈদুল ফিতর নামে পরিচিত। আরেকটি উৎসব পালন করা হয় জিলহজ মাসে হজের সময়, যেটি ঈদুল আযহা নামে পরিচিত,” যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এই শিক্ষক।

প্রথম পশু কোরবানি
হিজরি দ্বিতীয় সালে প্রথমবারের মতো ঈদুল আযহা উদযাপন করা হয় বলে জানাচ্ছেন মুসলিম পণ্ডিতরা।
“মূলতঃ ওই সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী করিমের (সা.) কাছে কোরবানি করার বিষয়ে নির্দেশনা আসে এবং সেটি মেনে তিনি প্রথমবারের মতো পশু কোরবানি করেন,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হোরায়রা।
ইসলামের নবীর এই কোরবানির মধ্য দিয়ে নবী ইব্রাহীমের প্রবর্তিত কোরবানির রীতি ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানান ইসলামি গবেষকরা।
“ইসলামের অনেক কিছুই আগের পয়গম্বরদের রীতি মেনে করা হয়েছে। যেমন প্রথম দিকে বায়তুল মোকাদ্দেসের দিকে সিজদা করা হলেও পরবর্তীতে ইব্রাহিম (আঃ) এর আদর্শ অনুযায়ী কাবার দিকে সিজদা করা হয়। কোরবানির ব্যাপারটিও তেমনি এসেছে,” বলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী।
প্রথম কোরবানির সময় ইসলামের নবী কী ধরনের পশু বেছে নিয়েছিলেন এবং কীভাবে সেটি উৎসর্গ করেছিলেন, একাধিক বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থে সেটার একটি বর্ণনা উল্লেখ রয়েছে বলে জানান মুসলিম পণ্ডিতরা।
ছবির উৎস, Sazzad Hossain/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
“সেগুলোর মধ্যে বুখারী শরীফের ৫,৫৫৪ নম্বর হাদিসে আনাস ইবনে মালিক, যিনি নবী করিমের (সা.) অন্যতম ঘনিষ্ঠ একজন সাহাবী ছিলেন, তিনি বর্ণনা করে বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি সাদা-কালো রঙের শিংওয়ালা দুম্বার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং নিজ হাতে সেগুলো কোরবানি করলেন,” বলেন মি. হোরায়রা।
মিশকাত শরীফের কোরবানি সংক্রান্ত অধ্যায়ে এ বিষয়ে আরেকটি হাদিসের উল্লেখ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা।
“সেখানে আনাস (রা.) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি তিনি দুইটা নাদুস-নুদুস বা মোটাসোটা ধরনের শিংওয়ালা দুম্বা বেছে নেন এবং সেগুলোর গায়ে পা রেখে জোরে আল্লাহু আকবার বলে নিজ হাতে জবাই করেন,” বলেন মি. পাটোয়ারী।
“দু’টো দুম্বার মধ্যে তিনি একটি দিতেন নিজের পক্ষ থেকে, আরেকটি দিতেন উম্মতের পক্ষ থেকে,” যোগ করেন জাতীয় ইমাম সমিতির এই সভাপতি।
কোরবানির ওই ঘটনাটি ঘটেছিল ঈদুল আযহার নামাজের পর, যা এখনও অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
“হাদিসে বলা আছে যে, ঈদের নামাজের আগে হলে সেটা কোরবানি হবে না, নরমাল জবাই হবে। আর নামাজের পরে হলে সেটা হবে কোরবানি,” বলেন মি. পাটোয়ারী।
ছবির উৎস, Getty Images
আরও যেসব পশু কোরবানি দেন
মুসলিম পণ্ডিতরা বলছেন, হিজরি দ্বিতীয় সনে শুরু করার পরবর্তীতে ইসলামের নবী প্রতিবছরই নিয়মিতভাবে কোরবানি দিতেন।
“তিরমিজি শরীফের হাদিসে উল্লেখ আছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বলেছেন, হিজরতের পরে রাসুল (সা.) দশ বছর মদিনায় ছিলেন, তার দশ বছরেই কোরবানি করেছেন,” বলেন মি. পাটোয়ারী।
দুম্বার পাশাপাশি ইসলামের নবী উট, গরু এবং মেষ বা ভেড়াও কোরবানি দিয়েছেন বলে জানান ইসলামি চিন্তাবিদরা।
“এক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) সবসময় পরিণত বয়সের মোটাতাজা, শিংওয়ালা, সুস্থ ও সুন্দর পশু বেছে নিতেন। আর দুম্বা, মেষ বা ভেড়া কোরবানির ক্ষেত্রে খাসি করাগুলো নিতেন। এটা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,” বলেন মি. হোরায়রা।
ছবির উৎস, Sazzad Hossain/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
ইসলামি গবেষকরা বলছেন, হজ বা ওমরাহ করতে যাওয়ার সময় ইসলামের নবী ও তার সঙ্গীরা কোরবানির উদ্দেশ্যে সঙ্গে করে পশু নিয়ে যেতেন। ওইসব পশুকে বলা হত ‘হাদি’।
“ষষ্ঠ হিজরিতে বা ৬২৮ খৃষ্টাব্দে যখন রাসূল (সাঃ) ওমরাহের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন হুদাইবিয়ায় বাধা দেয়া হলে তিনি তাবুতে অবস্থান করেন। হুদাইবিয়ার সন্ধি হলে তিনি সেই সময় নিজের ও পরিবারের জন্য উট কোরবানি দেন,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মিয়াজী।
সেসময় নবী মোট ৬৩টি উট কোরবানি দিয়েছিলেন বলে জানান এই গবেষকরা।
তখন কোরবানি ছাড়া আরেকটা রীতি ছিল। পশুগুলোর সিনায় কেটে দাগ লাগিয়ে মক্কার দিকে ছেড়ে দেয়া হতো, যাতে বোঝা যেতো যে এগুলো কোরবানির পশু। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর কিছু পশু কোরবানি দেয়া হয়, আর কিছু পশুকে সিনায় দাগ লাগিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
“এরপর দশম হিজরিতে রাসূল (সাঃ) মক্কা বিজয় করেন। ওই বছর তিনি নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে হজ করেন এবং কোরবানি দেন। সেটিই ছিল রাসূলের (সা.) শেষ হজ,” বলেন ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী।
বিদায় হজ নামে পরিচিত ওই হজে ইসলামের নবী একশটি উট কোরবানি দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
“এর মধ্যে ৬৩টি উট নবী করিম (সা.) নিজে জবাই করেছিলেন, বাকিগুলো হযরত আলী (রা.) জবাই করেন বলে জানা যায়,” বলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী।







