Home LATEST NEWS BANGLA এশিয়া কাপে আরো একবার ভূলুণ্ঠিত ক্রিকেটের সৌজন্য

এশিয়া কাপে আরো একবার ভূলুণ্ঠিত ক্রিকেটের সৌজন্য

5
0

Source : BBC NEWS

রবিবার দুবাইতে অনুষ্ঠিত নারীদের এশিয়া কাপ ফাইনালের ঘটনায় বিতর্ক

ছবির উৎস, Photo by Sameera Peiris/Getty Images

বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্কে উত্থানপতন বা রাজনীতি থেকে কূটনীতির প্রভাব অনেক সময় ক্রিকেটের ওপরেও এসে পড়তে দেখা গেছে। কখনও ক্রিকেটের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যেমন শুরু হয়েছে, আবার কখনও ক্রিকেটের মাঠেই কোনও দেশ তার রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। রবিবার দুবাইতে অনুষ্ঠিত নারীদের এশিয়া কাপ ফাইনালে তার আরেকটা উদাহরণ তৈরি হলো।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানি খেলোয়াড় ও তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে করমর্দন করা থেকে বিরত থেকেছেন। গত বছর এশিয়া কাপে পুরুষ দলের পর এবার ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করল।

ট্রফি না নেওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার পর এই প্রশ্ন উঠছে, যে খেলা বিভিন্ন সময় কূটনীতির অঙ্গ হয়ে থেকেছে সেই ক্রিকেটই কি তার স্বতস্ফুর্ত সৌজন্য ও স্পোর্টসম্যানশীপ হারাচ্ছে?

গত বছরও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি, যিনি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতিও। সেই হিসাবেই তিনি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ছিলেন।

এই মাঠেই গত বছর সেপ্টেম্বের ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল এশিয়া কাপ জেতার পরও তার হাত থেকে ট্রফি নিতে রাজি হয়নি। এবার মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ নিতে অস্বীকার করল ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল।

২০২৫ সালে পহেলগামের ঘটনার পর থেকেই দুই প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক সৌজন্য তলানিতে ঠেকেছে। সম্প্রতি ভারতে আয়োজিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ বিবৃতিতেও পহেলগামের ঘটনার নিন্দা করেছে ব্রিকসে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি। ভারত বরাবরই এ বিষয়ে তাদের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

রবিবার দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত নারী টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের ফাইনালে জয়ের পর, ভারতীয় দল এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ নিতে অস্বীকার করায় ফের একবার বাইশ গজেও দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির আঁচ স্পষ্ট। যা নিয়ে নতুন করে দুদেশে চর্চা শুরু হয়েছে।

গত বছর পুরুষদের এশিয়া কাপ ক্রিকেটে  ভারত জয়ী হয়েও মহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে রাজি হয়নি ভারতীয় ক্রিকেট দল

ছবির উৎস, Photo by Sajjad HUSSAIN / AFP via Getty Images)

এশিয়া কাপের ফাইনালে কী ঘটল?

ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ভারত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ১৮৩ রান সংগ্রহ করে; জবাবে শ্রীলঙ্কা দল ২০ ওভারে ১১১ রানে অলআউট হয়ে যায়।

শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারানোর পর ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল নিজেদের মধ্যে উদযাপন করতে শুরু করে। সেখানে অধিনায়ক হরমনপ্রীত কাউরও উপস্থিত ছিলেন। তবে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাকে দেখা যায়নি।

নির্ধারিত সময়ের ৪০ মিনিট পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হয়।

এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি হিসাবে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেলেন মহসিন নাকভি, যিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও।

আম্পায়ারদের স্মারক এবং রানার্স-আপ শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের পদক ও পুরস্কারের চেক প্রদান হলেও বিজয়ী দলকে ট্রফি নিতে দেখা যায়নি।

দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর ভারতীয় দল জানিয়ে দেয় তারা ট্রফি নিতে চায় না। ফলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সেখানেই শেষ হয়।

খেলা শেষের পর সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতীয় নারী দলের কোচ অমল মুজুমদার বলেন, “বিসিসিআই যে অবস্থান নিয়েছে, আমরা তার পাশে আছি এবং তাকে সমর্থন করছি। আমাদের কাছে এই টুর্নামেন্ট শেষ এবং আমরাই চ্যাম্পিয়ন। এটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। বড় বোর্ডেও লেখা ছিল যে ভারত এশিয়া কাপ ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন।”

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি

ছবির উৎস, Photo by Sajjad HUSSAIN / AFP via Getty Images

ভারত ও পাকিস্তান – কার কী বক্তব্য?

বিসিসিআই-এর সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা আইএএনএসকে বলেন, “এশিয়া কাপের ট্রফি নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমাদের পুরুষ দল প্রায় দেড় বছর আগে এশিয়া কাপ জিতেছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পহেলগামের ঘটনার পর দেশের মানুষ চান না আমরা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখি।”

”কিন্তুআমাদের সরকারের নীতি হো, বহুজাতিক টুর্নামেন্টে আমাদের প্রতিটা দেশের বিপক্ষে খেলতে হবে। আমরা সেই নীতি অনুসরণ করে খেলেছি, সব দলের বিপক্ষে দল পাঠিয়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সব শর্ত আমরা মেনে নেবো।”

তিনি বলেন, ”যে দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক আগে থেকে খারাপ ছিল এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের পর আরো খারাপ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান এখনো চলছে। তাদের অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা (মহসিন নাকভি) যিনি আমাদের দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। আমরা তার কাছ থেকে ট্রফি নিতে পারি না। দেড় বছর আগেআমাদের ছেলেরা যেমন তার কাছ থেকে ট্রফি নেয়নি, তার সাথে মিল রেখে আমাদের নারী দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, একই রকম পরিস্থিতিতে আমরা ট্রফি নেবো না।”

রবিবারের ঘটনার সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তানও। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘ডন’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী গোটা ঘটনাকে “অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক” বলেছেন।

তিনি ভারতের “খেলাসুলভ মনোভাব বা স্পোর্টসম্যান স্পিরিট” নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ভারতকে “ক্রীড়া সংস্কৃতি ধ্বংস করার” জন্যও দায়ী করেছেন।

স্থানীয় পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমকে মি চৌধুরী বলেছেন “আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতি শান্তি ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে এসেছে এবং অনেক যুদ্ধ অবসানেও ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু এখন তা দুর্বল হয়ে পড়ছে।”

তার মতে পাকিস্তান খেলাধুলাকে রাজনীতির অংশ করেনি কিংবা দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের হাতিয়ারও বানায়নি।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা রকম অস্বস্তির উপাদান দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস, Photo by AFP via Getty Images

ক্রিকেট কি সম্প্রীতি হারাচ্ছে?

কেবল ভারতের মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করাই নয়, এই এশিয়া কাপেই সেমি ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে খেলার সময় বাংলাদেশের অধিনায়কও ভারতের অধিনায়কের সঙ্গে করমর্দনে অস্বীকার করেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা রকম অস্বস্তির উপাদান দেখা যাচ্ছে।

চলতি বছর আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে খেলানোর কথা ঘোষণা করার পরও ভারতীয় বোর্ডে নির্দেশে তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারতে আয়োজিত বিশ্বকাপ বয়কট করে।

এই সবই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব খেলার মাঠে পড়ার উদাহরণ।

ভারতে আইপিএল শুরু হওয়ার পর প্রথম মরশুমে শোয়েব আখতার, উমর গুল, শোয়েব মালিক সহ ১১ জন পাকিস্তানের জাতীয় দলের ক্রিকেটার আইপিএল খেলার সুযোগ পান।

পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক ভাবে নিষিদ্ধ না হলেও কোনও মরশুমে কোনও পাকিস্তান ক্রিকেটারকে আইপিএলে খেলতে দেখা যায়নি।

২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর স্থগিত হয়ে যাওয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয় ভারত

ছবির উৎস, Photo by Daniel Berehulak-Pool/Getty Images

ক্রিকেট কি শুধুই খেলা, নাকি কূটনীতিরও হাতিয়ার?

ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমীকরণের ছায়া বাইশ গজেও বরাবর পড়ে এসেছে।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে বরাবরই আলাদা উন্মাদনার কারণ, তবে অতীতে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যা মনে করিয়ে দেয় দুদেশের রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেও ক্রিকেট সৌজন্যের নজির স্থাপন করেছে।

কার্গিল যুদ্ধের পর যখন ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে তখন ক্রিকেট সাক্ষী থেকেছে অন্যরকম সৌজন্যের।

২০০৪ সালে ভারত পাকিস্তানে টুনামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ভারতীয় দলের তৎকালীন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে বলেছিলেন “খেল হি নহি, দিল ভি জিতিয়ে” অর্থাৎ শুধু খেললেই জবে না – মনও জিতে আসুন।

সৌরভ গাঙ্গুলীর আত্মজীবনী, “আ সেঞুরি ইজ নট এনাফ, মাই রোলার কোস্টার রাইড টু সাকসেস” বইতে তিনি সেই সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে তিনি জানিয়েছেন মি বাজপেয়ী তাকে ও তার দলকে পাকিস্তানে খেলতে যাওয়ার আগে কী ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ভারতীয় দলের তৎকালীন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে বলেছিলেন

ছবির উৎস, PRAKASH SINGH/AFP via Getty Images

কেবলমাত্র তাই নয়। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ২০১১ সালে মোহালিতে পাশাপাশি বসে বিশ্বকাপ সেমি ফাইনাল ম্যাচ দেখেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি।

২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর স্থগিত হয়ে যাওয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে শান্তির নিদর্শন হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

পুলওয়ামা ও পহেলগামের ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আবারও দূরত্ব তৈরি করেছে।

সেই দূরত্ব কমাতে বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্য কি ফের ক্রিকেট মধ্যস্থতার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বলে যারা আশা করছিলেন, এশিয়া কাপ ফাইনাল তাদের প্রত্যাশায় আরো একবার জল ঢেলে দিল।