Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Martin Rose/Bongarts/Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
সিডনি অলিম্পিকে ওয়েটলিফটিংয়ে ২০০০ সালে ব্রোঞ্জ জিতে অলিম্পিক পদকজয়ী প্রথম ভারতীয় নারী হয়েছিলেন কর্ণম মাল্লেশ্বরী।
তবে পদক জেতা তো দূরের কথা, অন্ধ্রপ্রদেশের এই তরুণীর কাছে অলিম্পিকে পৌঁছানোই ছিল এভারেস্ট জয় করার মতো কঠিন এক লড়াই।
সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা, সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি। প্রশিক্ষণের জন্য নিজের শহর শ্রীকাকুলাম ছেড়ে বোনকে নিয়ে চলে আসেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে।
সঙ্গে এসেছিলেন তাদের মা-ও। কারণ, হোটেলে থাকার খরচ বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মেয়েদের রান্না করে খাওয়ানোর জন্যই তিনি তাদের সঙ্গে দিল্লি যান।
আজ, ২৬ বছর পরে, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলক, কর্পোরেট দুনিয়ার চাকচিক্য আর ‘নতুন ভারত’-এর নানা স্লোগানের মাঝেও ভারতীয় খেলোয়াড়দের বাস্তবতায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি, অন্তত পথচলার শুরুর দিকে।
এখনও কোনও পরিবারের সদস্য গরু-বলদ বিক্রি করছেন, কেউ পৈতৃক জমি বিক্রি করছেন, আবার কেউ ঋণ নিচ্ছেন শুধু এই আশায় যে তাদের সন্তান যেন খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারে।
নারী খেলোয়াড়দের সামনে চ্যালেঞ্জটা আরও বড়। মাঠে নিজেদের প্রমাণ করার পাশাপাশি তাদের সামাজিক নানা বাধাও অতিক্রম করতে হয়।
এমনই কয়েকজন ভারতীয় নারী খেলোয়াড়ের গল্প তুলে ধরা হয়েছে এখানে, যারা নানা প্রতিকূলতাকে হারিয়ে জাপানের নাগোয়ায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং পদকও জিতেছেন।
ছবির উৎস, Ranjith Kumar/NurPhoto via Getty Images
মীরবাই চানু
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসেছেন মীরাবাই চানু।
আজ তিনি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়াতারকা হলেও শুরুর পথটা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
নাগোয়ায় তিনি সেই পদকটি জিতেছেন, যার অভাব দীর্ঘদিন ধরে তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ২৮ বছর পর ওয়েটলিফটিংয়ে ভারতকে এশিয়ান গেমসের পদক এনে দেওয়াটা তার জন্য বড় অর্জন।
স্বর্ণপদক হাতছাড়া হলেও রুপোর পদকের গুরুত্ব কোনও অংশে কম নয়।
মণিপুরের নংপক কাকচিং গ্রামের বাসিন্দা মীরাবাইয়ের বাড়ি ইম্ফল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তিনি।
বাবা সাইখোম কীর্তি সরকারি এক দফতরের শ্রমিক ছিলেন। সংসারের বাড়তি খরচ সামলাতে মা তোম্বি দেবী চালাতেন একটি চায়ের দোকান।
বক্সার মেরি কমের মতো মীরাবাইকেও ছোটবেলায় জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ কুড়িয়ে আনতে হতো। মাকে সাহায্য করার পাশাপাশি এতে কিছু খরচও বাঁচত।
অনেকের মতে, সেখান থেকেই তার শক্তির পরিচয় মেলে। মাত্র ১২ বছর বয়সে একদিন ভাইয়ের সঙ্গে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি অনায়াসে এমন এক বোঝা তুলে নেন, যা তুলতে তার ভাইয়ের কষ্ট হচ্ছিল। সেই বোঝা কাঁধে নিয়েই প্রায় ২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।
সেখান থেকেই শুরু হয় তার ওয়েটলিফটিংয়ের পথচলা।
পরে সাবেক ওয়েটলিফটার অনিতা চানুর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে কখনও বাসে, আবার কখনও ট্রাকে লিফট নিয়ে যাতায়াত করতেন মীরাবাই।
ছবির উৎস, Reuters
নিকিতা কুমারী
ইরানের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়েছিলেন নিকিতা কুমারী।
ভারতের কবাডিতে স্বর্ণপদক জেতায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ বছরের নিকিতা ফাইনালে যেমন ডিফেন্সে ভরসা জুগিয়েছেন, তেমনই রেইডার হিসেবে দলের জন্য ৫ পয়েন্টও আদায় করেছেন।
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার ও তার পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।
হরিয়ানার হিসার জেলার হাসনগড় গ্রামের বাসিন্দা নিকিতার বাবা অনিল নায়ন একজন কৃষক এবং মা বিনোদ কুমারী গৃহিণী।
সাত ভাইবোনের মধ্যে নিকিতা চতুর্থ। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তার স্বপ্নপূরণে সবসময় পাশে থেকেছেন বাবা-মা।
এক আত্মীয়াকে খেলতে দেখে আট বছর বয়সে কাবাডির প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।
হরিয়ানার হয়ে খেলতে নেমে ১৭ পয়েন্ট সংগ্রহ করে নজর কাড়েন এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন।
ছবির উৎস, BEN STANSALL/AFP via Getty Images
মনপ্রীত কৌর
২০০৬ সালে প্রথম জুনিয়র জাতীয় শিরোপা জিতেছিলেন মনপ্রীত কৌর।
৩৬ বছর বয়সে এসে শট পুটে ব্রোঞ্জ জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তিনি। আরও বিশেষ বিষয় হলো, জাপানের স্টেডিয়ামে বসেই তার স্বামী ও ১৪ বছরের মেয়ে সেই মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন।
পাঞ্জাবের সহৌলি গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম মনপ্রীতের। ১২ বছর বয়সেই বাবাকে হারান তিনি। পরে তার মা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন এবং আজও সেই শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন।
এত প্রতিকূলতার পরও খেলাধুলার প্রতি তার একাগ্রতা কখনও কমেনি।
ছবির উৎস, Zhizhao Wu/Getty Images
রোশিবিনা দেবী
চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যেও নিজের খেলা চালিয়ে গেছেন রোশিবিনা দেবী।
মীরাবাই চানুর মতো তিনিও মণিপুরের বাসিন্দা। বিষ্ণুপুর জেলায় তার বাড়ি। সাধারণ কৃষক পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। বাবা দামু সিং মেয়ের প্রতিভা চিনতে পেরে এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
মেয়ের প্রশিক্ষণ ও যাতায়াতের খরচ জোগাতে তিনি নিজের জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দেন।
বদলে রোশিবিনা জাপানে জিতে নিয়েছেন তার তৃতীয় এশিয়ান গেমস পদক। এর আগে তিনি ২০১৮ সালে জাকার্তায় ব্রোঞ্জ এবং ২০২২ সালে হাংঝৌতে রুপোর পদক জিতেছিলেন।
হাংঝৌ গেমসের সময় মণিপুরে অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। রোশিবিনার ভাষ্য অনুযায়ী, দাঙ্গার জেরে তার বাবা মাঠেও যেতে পারতেন না। সংসারের আর্থিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল, তবু বাবা-মা কখনও তার মনোবল ভেঙে পড়তে দেননি।
পাটিয়ালার প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে সেখানে পৌঁছতে হয়েছিল তাকে।
ছবির উৎস, MOHD RASFAN / AFP via Getty Images
সীমা কুমারী
এক হাজার মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জজয়ী সীমা কুমারীর গল্পও যেন আরেক অনুপ্রেরণার কাহিনি।
হিমাচল প্রদেশের চাম্বায় ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা জীবনের গতি বদলে দেয়। কিন্তু সীমা হাল ছাড়েননি।
তার মা বলেন, ছোটবেলা থেকেই সীমা ছিলেন দৃঢ় এবং সাহসী। খেলাধুলার প্রতি তার টানও ছিল প্রবল।
সাত ভাইবোনের পরিবারে বাবাকে হারানোর পর সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতিতে খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হতে পারত।
কিন্তু সীমা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।
চম্বার রেতা গ্রামের সীমা মাত্র ১১ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে ধর্মশালার স্পোর্টস অথরিটি হোস্টেলে থেকে অ্যাথলেটিক্সের প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
জাপানে তিনি প্রিজা শ্রীধরন ও কবিতা রাউতের পর এশিয়ান গেমসের ১০,০০০ মিটার দৌড়ে পদকজয়ী তৃতীয় ভারতীয় নারী হন।
দৌড়ের সময়ে তার জুতোর স্পাইকে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও দমে যাননি তিনি।
মজার বিষয় হলো, এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপান যাচ্ছেন, সেই খবর আগে নিজের মাকে জানাননি সীমা। তার আশঙ্কা ছিল, হৃদরোগে আক্রান্ত মা অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন।
তবে তিনি জানতেন না, টেলিভিশনের পর্দায় মেয়ের দৌড় দেখেছেন তার মা।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, সীমার বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন তিনিই।
এই সাহসী নারীদের গল্প ইতিমধ্যেই বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। এশিয়ান গেমস শেষ হলে তাদের নিয়ে আরও অনেক লেখা হবে।
উদযাপন, প্রশংসা আর আলোচনার ভিড়ে সমাজের পরিচিত মুখ ও নেতারা তাদের সঙ্গে ছবি তুলবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গল্পগুলো আবারও আড়ালে চলে যাবে, পরের কোনও বড় ক্রীড়া আসর না আসা পর্যন্ত।
আর তখন আবারও ফিরে আসবে একই বাস্তবতা, একই সংগ্রামের গল্প।




