Home LATEST NEWS BANGLA ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার বাইরে যে পাঁচ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার বাইরে যে পাঁচ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

4
0

Source : BBC NEWS

মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছেন একজন কর্মী, সামনে একটি ভাসমান খাবারের দোকানের পাশে একটি বেঞ্চে বসে আছেন দুইজন নারী

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই মাস থেকেই বাড়ছে। তবে অগাস্টের তিন সপ্তাহেই জুলাইয়ের চেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে (১৯ শে অগাস্ট পর্যন্ত) প্রায় ১১ হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এর আগে জুলাইয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নয় হাজার ২০০-এর বেশি ডেঙ্গু রোগী।

এদিকে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৭৬ জন মারা গেছেন। আর আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি।

তবে অন্যান্য বছরের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন আর মূলত রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক নয়। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।

ফলে কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গু দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং সামনে পরিস্থিতি কোথায় বেশি খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে সাধারণত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা সামনে আরও বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

হাসপাতালের বেডে জায়গা না হওয়ায় মেঝেতে রোগী (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ঢাকার বাইরে বেশি সংক্রমণ যে পাঁচ জেলায়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩৪ জন এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাত হাজারের বেশি রোগী।

আক্রান্ত ও মৃ্ত্যুর হিসাবে ঢাকাতেই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

ঢাকার বাইরে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে খুলনা জেলায়। এই জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৬০০ জনেরও বেশি। মৃ্ত্যুর দিক থেকেও সর্বোচ্চ খুলনা জেলা, যেখানে এই রোগে মারা গেছেন মোট ১৪ জন।

এরপরই হলো চট্টগ্রাম জেলা, সেখানে আক্রান্ত এক হাজার ৩৯১ জন, মারা গেছেন তিনজন।

তৃতীয় অবস্থানে বরিশালের পিরোজপুর। সেখানে এ বছর এখন পর্যন্ত এক হাজার দু’শোর বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন এক জন।

আক্রান্তের দিক থেকে চতুর্থ স্থানে আছে ময়মনসিংহ জেলা। সেখানে ৯২৪ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয় জন।

ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে এখন পর্যন্ত ৭২০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সেখানে কারও মৃত্যু হয়নি। এই বিভাগে শুধু ঢাকার মানিকগঞ্জে একজন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।

ডেঙ্গু

এই পাঁচ জেলা কেন বেশি ঝুঁকিতে

একসময় সাধারণত ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা গেলেও এবার ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে বলেন যে, তারা হিসেব করেছিলো যে এ বছর উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে বরগুণা, ঝালকাঠী ও পিরোজপুরে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে।

এর একটি কারণ হিসেবে উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা ও বছরব্যাপী বৃষ্টির পানি মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

কোনো পাত্র বা স্থানে ৪৮ ঘণ্টার বেশি পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার ডিম পাড়া ও লার্ভা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে উল্লেখ করে তিনি জানান, সংরক্ষিত পানিতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করলে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু কিছু এলাকায় এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা করা হলেও সব লবণাক্ত এলাকায় একইভাবে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়নি।

গাজীপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপের ক্ষেত্রে ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন ডা. মুশতাক।

তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ওই এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ব্যক্তিগতভাবে সম্ভব নয়। সেখানের পরিবেশের মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন।

ময়মনসিংহের ক্ষেত্রেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পানি জমে থাকার মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড় চট্টগ্রাম বিভাগে। ডেঙ্গু আক্রান্তের দিক থেকে এবার চট্টগ্রাম জেলা দ্বিতীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম পাহাড়ি বা গাছপালাযুক্ত এলাকা হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে সেখানে। কিন্তু ডেঙ্গুর বিস্তারের মূল কারণ সেটি না।

“চট্টগ্রাম আর ঢাকা একই রকম। পাহাড়ি এলাকা জনবিরল হলে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু যখন সেটি ঘনবসতিপূর্ণ হয়, তখনই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে,” বলছিলেন ডা. মুশতাক।

এদিকে, কীটতত্ত্ববিদ ও জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, উপকূলীয় এলাকা ছাড়াও যেসব এলাকার পানিতে আর্সেনিক বেশি, ওই সব এলাকায়ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হতে পারে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় মানুষ অনেক সময় আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন পাত্রে জমিয়ে রাখেন। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পানি সংরক্ষণ করা হলে সেসব পাত্র এডিস মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।

মশার উপদ্রব বৃদ্ধিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ডেঙ্গু বাড়ার পেছনে আর কী কী কারণ?

পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। বাংলাদেশে যেসব প্রজাতি বেশি দেখা যায় তার মধ্যে অ্যানোফিলিস, এডিস ও কিউলেক্স এই তিন ধরনের মশাই বেশি ক্ষতিকর।

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়। এডিস মশার কামড়ে ছড়ায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া। আর ফাইলেরিয়া বা গোদরোগের কারণ কিউলেক্স মশার কামড়।

ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হলো এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস এলবোপিকটাস জাতের মশা।

কীটতত্ত্ববিদ মনজুর আহমেদ চৌধুরী জানান, এডিস ইজিপ্টাই প্রধানত শহরকেন্দ্রিক। আর এডিস এলবোপিকটাস জাতের মশা গাছপালা বেশি থাকা গ্রামীণ এলাকায় বেশি দেখা যায়।

“হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, দইয়ের পাত্রসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস ইজিপ্টাই বংশবিস্তার করে। সেজন্য একে বলাই হয় কন্টেইনার ব্রিডিং মসকুইটো। অন্যদিকে, গাছের কোটর বা কচুর পাতার গোড়ার মতো প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা স্থানে এডিস এলবোপিকটাস মশার প্রজনন হয়।”

তার মতে, ডেঙ্গু ছড়ানোর ক্ষেত্রে এডিস ইজিপ্টাই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর বাহক। তবে কোনো কোনো এলাকায় এলবোপিকটাস-ই প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।

এমন এলাকাও আছে যেখানে এডিস ইজিপ্টাই পাওয়া না গেলেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণেই ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দেশের কিছু জেলা ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠেছে (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, আগে কেবল শহর এলাকায় এডিস মশার প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও বর্তমানে নগরায়নের প্রভাবে গ্রামেও এটি পৌঁছে গেছে।

মি. চৌধুরী বলেন, গ্রামেও এখন এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ বেড়ে গেছে।

আজ থেকে দুই- তিন দশক আগে ঢাকার যেসব এলাকায় নিয়মিত পানির সংকট ছিল, সেখানে মানুষ ড্রাম বা বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখতেন। পুরান ঢাকার কিছু এলাকা এবং এলিফ্যান্ট রোডের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে একসময় পানির সংকটের কারণে ড্রামে পানি সংরক্ষণ করা হতো এবং সেসব পাত্রে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতো।

তবে এখন পরিস্থিতি আরও বদলেছে। মানুষের মাথাপিছু আয় ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পাত্রও বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আগে এত হাড়িপাতিল, পাত্র পাওয়া যেত না। এত ছাদবাগান ছিল না। এখন গ্রামেও অনেক মানুষ প্লাস্টিকের বোতলে পানি খায়। বিশেষ করে এই সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক শহর ও গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে দিয়েছে। তাই ডেঙ্গু মশা বাড়ছে।”

ফলে শহর ও গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে এডিস মশার জন্য নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।

এর বাইরে, সারাদেশে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার পেছনে আবহাওয়া ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঘাটতির কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেছিলেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও ঘন ঘন বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশা বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে।

তার মতে, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে স্থানীয় সরকার ভেঙে পড়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধিরা নেই। ফলে মশা নিধনের কাজ সেভাবে হয়নি। সেজন্যই মশা বেড়ে গেছে।”

ডেঙ্গি বা ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা।

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু কবে থেকে?

বাংলাদেশে কবে থেকে এডিস মশা আছে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

১৯৯৮ সালে কিছু রোগীর দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস ধরা পড়ে এবং পরের বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর অনেক রোগীর দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়া যায়।

২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও কিছুটা বাড়ে।

তখন থেকেই মূলত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কী করা যেতে পারে, এই বিষয়ে গবেষণা ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও নানা সচেতনতামূলক প্রচারণা একটু একটু করে শুরু হয়।

অধ্যাপক মুশতাক হোসেন বলছেন, অতীতে এডিস মশা থাকলেও ডেঙ্গু টেস্টের তেমন সুযোগ না থাকায় তার অস্তিত্ব নিয়ে এত বেশি গবেষণা বা চিন্তার সুযোগ ছিল না যেটা এখন সম্ভব।

আইইডিসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা প্রকট আকার ধারণ করে ২০১৯ সালে। সেই বছর এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ১৭৯ জন।