Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
দশ বছরের শিশুকন্যার ‘সাহসিকতার’ প্রশংসা করে আবেগঘন চিঠি লিখেছেন ভারতীয় একজন বিচারক। ধর্ষণের শিকার ওই শিশুকন্যাকে আশ্বস্ত করে সেই চিঠিতে ওই নারী বিচারক লেখেন, তার (ওই শিশুর) উপর যে ব্যক্তি নির্যাতন চালিয়েছিলেন “তার বাকি জীবন খাঁচার মধ্যেই কাটবে”।
সেই চিঠি বহু মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে।
নিম্ন আদালতের এই বিচারকের নাম রজনী রাঙ্গা। চিঠিতে ওই শিশুকে ‘ডিয়ার চাইল্ড’ সম্বোধন করে তিনি লিখেছেন, সে “এই আদালতের দেখা সবচেয়ে সাহসী ছোট্ট মেয়ে”।
২০২৩ সালে, ওই শিশুর বয়স যখন সাত বছর, তখন তার উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়।
এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করে বিচারক রাঙ্গা জোর দিয়ে বলেছেন, ওই ব্যক্তি “তার স্বাভাবিক জীবনের বাকি সময়টুকু” কারাগারের মধ্যেই থাকবেন।
পাশাপাশি ওই ব্যক্তিকে ভারতীয় মূল্যে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।
রায়দানের পর শিশুর উদ্দেশে কিছু লিখতে চেয়েছিলেন তিনি, তবে তা আদালতের আনুষ্ঠানিক ভাষায় নয়।
আদালতের নির্দেশ ঘোষণার পর বিচারক রাঙ্গা জানান, “আদালতের নির্দেশ ঘোষণার সময়ে ব্যবহৃত আনুষ্ঠানিক ভাষায় নয়, তাকে এমন একজন বিচারক হিসাবে ওই ভুক্তভোগী শিশুর উদ্দেশে কথাগুলো লিখতে হবে যে বিচারক তার (ওই শিশুর) কথা শুনেছেন, যিনি তার কথাগুলো পড়েছেন এবং যিনি তার সাহস দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।”
শিশুকন্যাকে লেখা ওই চিঠিতে বিচারক রজনী রাঙ্গা উল্লেখ করেছেন, “যখন তুমি বলেছিলে, “যবতক আঙ্কল বুড্ঢে না হো যায়ে, তব তক উনহে জেল মে হি রাখা যায়ে- (এই কাকুটি বৃদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাকে যেন জেলেই রাখা হয়), তখন সে কথা এই আদালত শুনেছিল এবং এই আদালত তোমার আবেদনে সাড়া দিয়েছে।”
ছবির উৎস, Getty Images
বিচারক আরো উল্লেখ করেছেন, “আজ আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, যাকে তুমি ‘আঙ্কল’ বলে ডাকতে, তিনি আর কখনো মুক্তি পাবেন না। বাকি জীবন খাঁচায় বন্দি অবস্থাতেই থাকবেন তিনি।”
“সে সেই খাঁচার ভিতরেই তিনি বৃদ্ধ হবেন। সেই খাঁচাতেই তার মৃত্যু হবে। তিনি আর কখনো তোমাকে, তোমার ছোট বোনকে বা অন্য কোনো শিশুকে আঘাত করতে পারবেন না।”
“আদালতে এসে, যে ব্যক্তি তার উপর নির্যাতন চালিয়েছিল তাকে চিহ্নিত করার এবং সত্য কথা বলার জন্য” বিচারক রাঙ্গা তার প্রশংসা করেছেন এবং ওই শিশুকন্যাকে “সবচেয়ে সাহসী ছোট্ট মেয়ে” বলে সম্বোধন করেছেন।
“যে ব্যক্তিকে তুমি ‘আঙ্কল’ বলে ডাকতে, তিনি তোমার সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করেছিলেন। কিন্তু তুমি চুপ করে ছিলে না। তুমি তোমার মাকে জানিয়েছিলে, আর যেহেতু তোমার সেটা বলার সাহস ছিল, তাই ওই ব্যক্তি আর কখনো অন্য কোনো শিশুকে আঘাত করতে পারবে না।”
“আদালত তোমাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যে তিনি আর কখনোই মুক্ত অবস্থায় সূর্য দেখতে পারবেন না।”
চিঠির শেষে বিচারক রাঙ্গা উল্লেখ করেছেন এই “আদালত তোমাকে তোমার শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারবে না”, তবে তাকে বাকি জীবন আনন্দে কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, “এখন তুমি তোমার জীবন উপভোগ করো। স্কুলে যাও। বন্ধু তৈরি করো। হাসো। খেলা করো। স্বপ্ন দেখো। এই আদালত তোমার সাহসের কথা সব সময় মনে রাখবে।”
ছবির উৎস, Getty Images
বিচারক রাঙ্গা গত ১১ই জুলাই এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়েরই অংশ এই চিঠি।
শিশুদের যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলো বিশেষ পকসো (প্রটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস, অর্থাৎ যৌন অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষার জন্য যে আইন রয়েছে) আদালতে বিচার করা হয়।
ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য এই ধরনের মামলার রায়ও কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।
নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা স্থগিত করা এবং জামিনের আবেদন জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে সম্প্রতি আবেদন জানিয়েছিলেন সাজাপ্রাপ্ত ওই ব্যক্তি। সেই আবেদনের অংশ হিসাবেই দেওয়া হয় বিচারপতি রাঙ্গার লেখা চিঠিটা। সেভাবেই চিঠিটি সামনে আসে।
দিল্লি হাই কোর্ট ওই ব্যক্তির আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
হাই কোর্টের আদেশে অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক ছাড়া তার সম্পর্কে আর কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি।
শিশুকন্যাকে উদ্দেশ করে লেখা বিচারক রজনী রাঙ্গার ওই চিঠিকে তার জন্য ‘উৎসাহের বার্তা’ হিসেবে বর্ণনা করে কর্তৃপক্ষকে চিঠির একটা অনুলিপি প্রিন্ট করে ক্ষতিপূরণের অর্থের সঙ্গে ওই শিশুটিকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
ছবির উৎস, ANI
বিচারকের এই আবেগঘন চিঠি বহু ভারতীয়র হৃদয় স্পর্শ করেছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে এই খবর শেয়ার করেছেন।
বিচারকের এই পদক্ষেপকে ‘বিরল’ এবং ‘আশার আলো’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিচারক রজনী রাঙ্গার প্রশংসাও করেছেন। একইসঙ্গে সাত বছরের ওই শিশুর উপর ঘটে যাওয়া অপরাধের প্রকৃতি এবং ভয়াবহতা সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশও করেছেন।
বিচারকের এই চিঠি বিরল হলেও বছর সাতেকের এই শিশুর মামলা বিরল নয়। বিশেষজ্ঞরা অন্তত তাই বলছেন।
ভারতে অপরাধ সংক্রান্ত সরকারি (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো) তথ্য অনুযায়ী শুধু ২০২৪ সালেই ভারতে ৬৯ হাজারেরও বেশি মামলা পকসো আইনের আওতায় নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
এই রিপোর্ট থেকে এও জানা যায় যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যিনি নির্যাতন চালিয়েছেন, তিনি ওই ভুক্তভোগীর পরিচিত এবং প্রায়শই বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা তার দেখাশোনা ও যত্ন নেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ঘটনায় অভিযোগও দায়ের করা হয় না।
ভুক্তভোগীরা প্রায়শই জানিয়েছেন কীভাবে এই ধরনের ঘটনা তাদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, কীভাবে সেটা তাদের গোটা জীবনের উপর প্রভাব ফেলেছে।
এর উল্লেখ বিচারক রাঙ্গার আদেশেও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন একজন শিশুর উপর কীভাবে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনা।
তিনি উল্লেখ করেছেন, “অপরাধের প্রকৃতি, দুর্ভোগের ব্যপ্তি এবং ভুক্তভোগী শিশুর উপর আজীবন প্রভাব” মূল্যায়ন করার পর তার এই আদেশ ওই শিশুকে “নিরাময় এবং পুনরুদ্ধারের একটা প্রয়াস।”




