Home LATEST NEWS BANGLA প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরও বেঁচে গেছেন টেনেসিতে ২০০ বছরের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া...

প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরও বেঁচে গেছেন টেনেসিতে ২০০ বছরের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রথম নারী

3
0

Source : BBC NEWS

টেনেসি সংশোধন বিভাগের বন্দি ক্রিস্টা পাইক

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রথম নারী ক্রিস্টা পাইক প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরও বেঁচে গেছেন।

ক্রিস্টা পাইকের আইনজীবীদের দাবি, বুধবার তাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দুটি প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও তার হৃদস্পন্দন চলছিল। বর্তমানে তিনি চিকিৎসা সেবার আওতায় রয়েছেন।

টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী। যুক্তরাষ্ট্রের ওই অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আর কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

পাইকের বন্ধু অ্যাশলি সেলার্স বলেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতে তাদের শেষবার যোগাযোগ হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাইক তার কারাকক্ষ থেকে তাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

সেলার্স জানান, পাইক তাকে বলেছিলেন যে বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তিনি চান না তার কোনো প্রিয়জন সেখানে উপস্থিত থাকুক।

“সে চায় না আমরা ওই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই,” বলেন সেলার্স।

এদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তার আইনি দল পাইকের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার জন্য একটি জরুরি আবেদন দাখিল করে জানায়, “মিস পাইক জ্ঞান হারিয়েছেন, কিন্তু তার হৃদস্পন্দন এখনও চলছে এবং তিনি স্পষ্টতই নাক ডাকছেন।”

তার একজন আইনজীবী বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, ৫০ বছর বয়সী পাইককে হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাকে দুই সিরিঞ্জ পেন্টোবারবিটাল দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৬ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

পাইকের বয়স যখন ১৮, তখন তিনি এবং তার তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ, ১৯ বছর বয়সী স্লেমারকে মারধর ও নির্যাতন করে হত্যা করেন। সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরিচালিত চাকরি বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে তাদের পরিচয় হয়েছিল।

স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ বলেছেন, তিনি চান এ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হোক। শনিবার তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, “যখনই আমি এ নিয়ে ভাবি, আমার মনে পড়ে কলিনের সে যন্ত্রণার কথা, যে উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছিল।”

পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বুধবার রাতে স্থানীয় সময় প্রায় আটটার দিকে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে তাকে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়া হয়।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, পাইককে পেন্টোবার্বিটালের দুটি ডোজ দেওয়া হয়েছিল এবং সাক্ষী কক্ষের পর্দা দুইবার বন্ধ করা হয়েছিল।

সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, এক পর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীদের চলে যেতে বলা হয়েছিল।

১৯৯৫ সালের হত্যাকাণ্ডে ছাত্রী কলিন স্লেমারকে নির্যাতন করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

পাইকের আইনি দল টেনেসিয়ান সংবাদপত্রকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, “আজ রাতে টেনেসি রাজ্য আবারও একটি আইনসম্মত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।”

“সঠিক প্রমাণিত হওয়া নিয়ে আমরা আনন্দিত নই, কিন্তু মিস পাইকের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। শিরা খুঁজে পেতে অসুবিধা, শিরা ফেটে যাওয়া, কার্যকারিতাহীন পেন্টোবার্বিটাল, এবং আকস্মিক ও অনিবার্য প্রয়োজনের সময় জরুরি চিকিৎসার অভাব – এই সবকিছুই এমন এক প্রোটোকলের অধীনে ঘটে যা কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা।”

প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগে দৃশ্যত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পাইকের আইনজীবীরা তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য একটি জরুরি আবেদন দাখিল করেছেন।

জেলা জজ ক্লিফটন এল কর্কার এক রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, “আবেদনে করা অনুরোধ অনুযায়ী চিকিৎসাকর্মীরা ইতোমধ্যে সেবা প্রদান শুরু করেছেন।”

টেনেসি সংশোধন বিভাগ জানিয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার সময় তারা যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার সবগুলোই সঠিক ছিল বলে তারা মনে করে।

“টেনেসি সংশোধন বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত রাজ্যের আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যপ্রণালীর প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে,” বিভাগের মুখপাত্র ডোরিন্ডা কার্টার টেনেসির স্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেছেন।

“প্রোটোকলে থাকা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের রাসায়নিকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং আজ (স্থানীয় সময় বুধবার) সন্ধ্যায় যা করা হয়েছে, তার বাইরে অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতির অনুমতি প্রোটোকলে নেই। ক্রিস্টা পাইককে কারাগারের বাইরের এক চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে,” তিনি বলেন।

এদিকে, এমোরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের অধ্যাপক ডক্টর জোয়েল জিভোট, যিনি পাইকের আইনি দলের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন, বিবিসিকে বলেছেন যে, “মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টার সময় সম্ভবত তার রক্তে পেন্টোবার্বিটালের মাত্রাই এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যা শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধের কারণ হতে পারে।”

একটি ইমেইলে জিভোট বলেছেন, “এটি খুবই সম্ভব যে পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া শুরু হতে বিলম্বের ফলস্বরূপ তার মস্তিষ্কের ক্ষতি (ব্রেইন ইনজুরি) হবে।”

পাইকের আইনজীবীদের শেষ মুহূর্তের একাধিক আইনি লড়াই ব্যর্থ হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা শুরু করা হয়।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রাণঘাতী ইনজেকশন বন্ধ করার দুইটি পৃথক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল।

বুধবার গভীর রাতে সুপ্রিম কোর্ট দিনের শুরুতে নিম্ন আদালতের দেওয়া একটি স্থগিতাদেশ বাতিল করে দিয়েছে। নিম্ন আদালত পাইকের মামলার যুক্তিগুলো বিবেচনার জন্য আরও সময় প্রয়োজন বলে মামলাটি স্থগিত করেছিল।

এর আগে সুপ্রিম কোর্ট পাইকের আইনজীবীদের করা এক আপিল খারিজ করে দেয়। সেখানে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে জুরি তার শৈশবে যৌন নির্যাতনের নথিভুক্ত ইতিহাসের মতো প্রমাণগুলো বিবেচনা করার সুযোগ পায়নি।

তবে, প্রতিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন যে, টেনেসি অঙ্গরাজ্য বছরের পর বছর ধরে আদালতে এই যুক্তি দিয়ে আসছে যে, তিনি শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে মিথ্যা বলেছিলেন।

কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক এক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, তিনি যে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, তা তারা অস্বীকার করেন না।

টেনেসির গভর্নর এ সপ্তাহে পাইকের ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন, যিনি রাজ্যের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় থাকা একমাত্র নারী।

২০০৬ সালে দণ্ড-পরবর্তী শুনানির জন্য আদালতের বাইরে কলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ এবং নক্সভিল পুলিশ বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা।

নিজের ক্ষমার আবেদনে পাইক বলেছেন যে, তিনি স্লেমারকে পেটাতে চেয়েছিলেন, হত্যা করতে নয়। কিন্তু তিনি নিজেকে সংযত করতে পারেননি।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “আমি তখন মানসিকভাবে অসুস্থ এক ১৮ বছর বয়সী কিশোরী ছিলাম। আমি যা করেছিলাম তার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতেই আমার বহু বছর লেগে যায়। আমি কতগুলো জীবনকে প্রভাবিত করেছি, তা মেনে নিতে আরও বেশি সময় লেগেছিল।

আমি কারও সন্তান, বোন, বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছি। এমন একটি অপরাধ করার ক্ষমতা আমার ছিল, এটা ভেবে এখন আমার গা গুলিয়ে ওঠে।”

১৯৯৫ সালে টেনেসির নক্সভিলে ওই হত্যাকাণ্ড গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার একটি বড় কারণ নিহত কলিনের বুকে সেসময় একটি উল্টো পেন্টাগ্রাম, যা শয়তানের উপাসনা করে এমন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত এক প্রতীক, খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

যদিও পাইক নিজে সে প্রতীক খোদাই করার কথা বরাবর অস্বীকার করে এসেছেন।

হত্যার আগে পাইক কলিনের বিরুদ্ধে তাকে অপমান করা এবং তার তৎকালীন প্রেমিককে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেছিল।

চাকুরি বিষয়ক ক্যাম্পের আরও দুজন বাসিন্দা পরে সাক্ষ্য দেন যে, পাইক হত্যাকাণ্ডটির আগে ও পরে তা নিয়ে দম্ভ করেছিল, এবং তাদেরকে কলিনের মাথার খুলির একটি টুকরো দেখিয়েছিল।

কলিনের মা মে মার্টিনেজ বলেছেন, পাইকের সাজা কার্যকর হতে দেখার জন্য তিনি কয়েক দশক ধরে অপেক্ষা করেছেন।

কয়েকদিন আগে তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রত্যক্ষ করার জন্য তাকে ও তার স্বামীকে ফ্লোরিডা থেকে টেনেসি আসার খরচ জোগাতে একটি দল তহবিল সংগ্রহে সাহায্য করেছে।

“এমন একটা দিন বা মিনিটও যায় না, যেদিন আমি কলিনের কথা ভাবি না। আর ছুটির দিনগুলো সবচেয়ে খারাপ কাটে,” মার্টিনেজ বললেন।

১৯৭৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১৮ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যেখানে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পুরুষের সংখ্যা ১,৬৬৩ জন।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় এক শতাংশ।