Home LATEST NEWS BANGLA রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কেন সব সময় খারাপ নয়

রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কেন সব সময় খারাপ নয়

6
0

Source : BBC NEWS

মেশিন দিয়ে নিজের রক্তের শর্করা পরীক্ষা করছেন একজন

রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ- অনেকের মধ্যেই দেখা যায় এই প্রবণতা। কিন্তু খাওয়ার পর এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। জেনে নিন কখন এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

গত কয়েক বছরে দুটি বিস্ময়কর বিষয় ঘটতে শুরু করেছে।

স্বাভাবিক, অথবা সুস্থ মানুষ এমন ডিভাইস ব্যবহার করতে শুরু করেছেন, যা তাদের সারাদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করতে দেয়। অন্যদিকে কেউ কেউ সাদা পাউরুটি ও পাস্তার মতো পরিশোধিত শর্করা সম্পূর্ণভাবে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।

আসলে লেখক, পডকাস্টার এবং সুস্থতা-সংক্রান্ত প্রভাবশালীরা এই ধারণা প্রচার করছেন যে আমাদের সবারই রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পর্যবেক্ষণ করা এবং তা এড়িয়ে চলা উচিত।

এই চরম দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, রক্তপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্লুকোজ প্রবেশ করতে দেওয়া বিপজ্জনক।

তাদের মতে, এমনকি যাদের কোনো বিপাকীয় রোগ নেই, সেই সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ব্রণ, মেজাজের ওঠানামা এবং আরও নানা সমস্যার কারণ হতে পারে।

তবে এখন বিশেষজ্ঞরা এই ধারণার বিরোধিতা করছেন। কখন উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, আর কখন কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘমেয়াদে কোনো ক্ষতি করার আশঙ্কা কম, তা এখানে তুলে ধরা হলো।

সাদা পায়জামা, সাদা ও ধুসর চেক শার্ট ও ভেতরে সাদা গেঞ্জি পরা একজন পেটের কাছে দুই হাত রেখে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করছেন

কেন রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়?

যখন আমরা পরিশোধিত চিনি, ফল বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের মতো মিষ্টিজাতীয় খাবার খাই ও হজম করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।

এর কারণ হলো, কার্বোহাইড্রেট ও চিনি হজমের সময় ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা পরে রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়। ফলে সাময়িকভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তখন অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ করে, যা গ্লুকোজকে রক্তপ্রবাহ থেকে শরীরের কোষে স্থানান্তর করতে সহায়তা করে, যাতে তা শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে পারে।

শুধু খাদ্যই নয়, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে পারে আরও কিছু বিষয়।

উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের সময় অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন যকৃতকে রক্তপ্রবাহে আরও বেশি গ্লুকোজ ছেড়ে দিতে সংকেত দেয়, যাতে কর্মরত পেশিগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি পায়। এর ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সাময়িকভাবে বাড়তে পারে বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের পেডিয়াট্রিক এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট জেনিফার শের।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করে না, অথবা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স)। ফলে খাবার খাওয়ার পর তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মানুষের ইনসুলিন বা মেটফরমিনের মতো ওষুধও গ্রহণ করতে হয়।

গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পুষ্টি ও খাদ্যনির্বাচন বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রাউন বলেন, “সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, প্রতিটি গ্লুকোজ স্পাইক ক্ষতিকর”।

সম্প্রতি আমি ছয় সপ্তাহ অতিরিক্ত চিনি খাওয়া বন্ধ রেখে একটি পরীক্ষা করেছিলাম। এরপর থেকে আমি বিশেষভাবে সচেতন হয়েছি যে, যখনই মিষ্টিজাতীয় খাবার খাই, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়বেই।

সাধারণত খাবার খাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরে রক্তে শর্করার মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে তা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। যদি এই বৃদ্ধি স্বল্পস্থায়ী হয় এবং ব্যক্তির বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে, তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে জানান ব্রাউন।

শের বলেন, সমস্যা তখনই হতে পারে যখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় ধরে উঁচু অবস্থায় থাকে। এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে শরীর স্বাভাবিকভাবে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ হতে পারে, যেখানে শরীর গ্লুকোজের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দেয় না।

দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা অনেক বেশি থাকলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে। একসময় এটি প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পরে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তশর্করার কারণে স্নায়ু ও চোখের ক্ষতি, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, অতিরিক্ত রক্তশর্করা সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েটিশিয়ান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নিকোলা গেস বলেন, বরং যখন আমরা শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলি, তখন অতিরিক্ত ক্যালোরি সাধারণত চর্বিতে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

এজজন নারী তার বাহুতে লাগানো মেশিনের কাছে মোবাইল নিয়ে রক্তের শর্করার মাত্রার জানার চেষ্টা করছেন

গ্লুকোজ মনিটরের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ ইতোমধ্যেই নিয়মিত তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন। এর একটি উপায় হলো কনটিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর (সিজিএম), যা সারাদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে।

এখন অন্যথায় সুস্থ মানুষের মধ্যেও এই ডিভাইসগুলোর জন্য একটি ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক বাজার তৈরি হয়েছে।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, যাদের ডায়াবেটিস নেই, তাদের জন্য এগুলো অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিসবিহীন অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা ৯৬ শতাংশ সময়ই স্বাস্থ্যকর সীমার মধ্যে ছিল।

আরও কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে এসব ডিভাইস “ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাসগত পরিবর্তনকে উৎসাহিত করতে পারে এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে”, বিশেষ করে যখন এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা প্রকৃত অবস্থার চেয়ে বেশি দেখায়।

সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় ব্রাউন এবং তার সহকর্মীরা দেখেছেন যে, ডায়াবেটিস নেই এমন মানুষের ক্ষেত্রে সিজিএম ব্যবহারে স্বাস্থ্যগত ফল উন্নত হয়- এমন সঙ্গতিপূর্ণ ও উচ্চমানের প্রমাণের অভাব রয়েছে।

তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

জেনিফার শের বলেন, নতুন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রক্তে গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণকারী ডিভাইসগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সিজিএম সত্যিই উপকারী কি না, তা নির্ধারণে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।

নানান রকম খাদ্যোপোকরণ সাজানো

ভারসাম্যপূর্ণ খাবারই সেরা

রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক এবং সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এর গুরুতর পরিণতি হওয়ার আশঙ্কা কম। তবু শরীরকে আরও স্থিতিশীল মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করার কিছু উপকারিতা রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত কমে গেলে ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে বেশি ক্যালোরি গ্রহণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের খাবার রক্তে শর্করার পরিবর্তনের মাত্রাকেও প্রভাবিত করে। যেসব খাবার রক্তে শর্করাকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখে, সেগুলো আমাদের দীর্ঘ সময় তৃপ্ত রাখতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য। অন্যদিকে সাদা পাউরুটি ও সাদা চালের মতো সাধারণ কার্বোহাইড্রেট দ্রুত রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়।

খাবারের ক্রমও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কার্বোহাইড্রেটের আগে প্রোটিন ও শাকসবজি খেলে, কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের পরে যে রক্তশর্করার বৃদ্ধি সাধারণত দেখা যায়, তা কমতে পারে।

আরেকটি পরামর্শ হলো এমন ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাওয়া, যাতে প্রোটিন, আঁশসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে। এটি হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করতে, আরও স্থিতিশীলভাবে শক্তি সরবরাহ করতে এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।

এটাও মনে রাখা দরকার যে আমাদের সবার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন খাবারের প্রতিক্রিয়া ভিন্নভাবে হতে পারে।

ব্রাউন বলেন, “ব্যক্তিভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে, এবং একই ব্যক্তি ঘুম, মানসিক চাপ, শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা অথবা খাওয়া খাবারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন।”

এ ছাড়া, কিছু কিছু ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট এড়িয়ে চলার যে পরামর্শ দেওয়া হয়, তা উল্টো ফলও দিতে পারে বলে মনে করেন গেস।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় সীমাবদ্ধতার পর যখন আমরা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাই, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কার্বোহাইড্রেটকে এখনো ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গেস সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছেন, নির্দিষ্ট প্রকৃতির খাবার সীমিত করলে অনেক সময় অকারণে এমন খাবারও বাদ পড়ে যায়, যা আমাদের জন্য উপকারী।

তাই গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের উপকারিতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, অন্তত একটি বিষয় মনে রাখা ভালো– আমাদের অধিকাংশই ইতোমধ্যেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অতিরিক্ত চিনি খেয়ে থাকি। বরং সেটি কমানোর দিকেই মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

এই নিবন্ধের সব তথ্য কেবল সাধারণ তথ্যগত উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

মেলিসা হোগেনবুম বিবিসির একজন জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদদাতা এবং ‘ব্রেডউইনার্স’ ও ‘দ্য মাদারহুড কমপ্লেক্স’ বইয়ের লেখক।