Home LATEST NEWS BANGLA হেফাজতে ইসলাম কী চেয়েছে বিএনপি সরকারের কাছে?

হেফাজতে ইসলাম কী চেয়েছে বিএনপি সরকারের কাছে?

4
0

Source : BBC NEWS

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে বৈঠক করেন

ছবির উৎস, Hefazat e islam bangladesh

বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে সংসদে আইন পাস, কুরআন-সুন্নাহ’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন আইন পাস না করা এবং শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে মোদীবিরোধী আন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই-অগাস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ বিএনপি সরকারের কাছে নয় দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

রোববার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য আয়োজিত সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় এসব দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থি সংগঠনটির নেতারা।

সেইসঙ্গে, রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামি পণ্ডিতদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

“উনারা আলেমদের নিয়ে জোট করেছেন, ইলেকশন করেছেন। কিন্তু সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আলেমদের রাখা হয় নাই। আমরা মনে করি, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সরকার পরিচালনায় আলেমদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলের হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

দাবি-দাওয়া পেশ করার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সেগুলো পূরণের আশ্বাস পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এমন একটি সময়ে এসব ঘটনা ঘটছে, যার কিছুদিন আগে দেশটির বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নেতারা অভিযোগ তুলেছেন যে, বর্তমান সরকার হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে তাদের জোট ভাঙার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে।

যদিও হেফাজতে ইসলাম এবং বিএনপি সরকার- উভয়ই এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তারপরও যে প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে বার বার সামনে চলে আসছে, সেটি হলো: সরকার কেন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে ‘সুম্পর্ক’ রক্ষা করতে চাচ্ছে? এর মাধ্যমে তারা কী অর্জন করতে চায়?

হেফাজতে ইসলামের আয়োজিত সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবির উৎস, Hefazat e islam bangladesh

নয় দফায় কী আছে?

রোববার বিকেলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আয়োজিত সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় যোগ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সেখানে সংগঠনটির আমির শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীসহ অন্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেসময় হেফাজতকে আগের মতো বিএনপির সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান।

অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে সরকার প্রধানের কাছে নয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।

সেগুলোর প্রথমটিতেই কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাস করার কথা বলা হয়েছে।

এটাও বলা হয়েছে যে, কুরআন-সুন্নাহ’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, এমন কোন আইন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস করা যাবে না।

তৃতীয় নাম্বারে হেফাজতে দাবি করেছে, ”২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে জড়িত, হুকুমের আসামী ও খুনিদের বিচার নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার কায়েম করা।”

সেইসঙ্গে, কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমানের যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেটি কার্যকর করার মাধ্যমে কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দুয়ার উন্মোচন করার দাবি জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, Hefazat e islam bangladesh

স্কুল-কলেজে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবিও করেছে হেফাজত। এক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে আলিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির উল্লেখ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এর বাইরে, কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।

বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ইসলামি পণ্ডিতের বিরুদ্ধে হওয়া ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার করে আলেম-ওলামাদের ‘রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনকাজে অংশীদার করা’র দাবিও তোলা হয়েছে।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ‘দেশি-বিদেশি মিশনারিগুলোর ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা’, বিশ্ব ইজতেমার সময় ভারতের মাওলানা সা’দের বাংলাদেশে আসায় নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে সা’দপন্থিদের ইজতেমা করার অনুমতি না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন হেফাজতের নেতারা।

দাবিগুলো শোনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল- জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, “তিনি বলেছেন যে, আমি একজন মুসলমান এবং এটা মুসলিম রাষ্ট্র। কাজেই ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড অতীতেও আমাদের সরকারের আমলে হয় নাই, ইনশাল্লাহ সেটা আমার সরকারের আমলেও হবে না।”

প্রধানমন্ত্রীর হাতে মানপত্র তুলে দেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা

ছবির উৎস, Hefazat e islam bangladesh

রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ

২০১০ সালে আত্মপ্রকাশ করা হেফাজতে ইসলাম এর আগেও বিভিন্ন সময় একই ধরনের দাবি জানিয়েছে। দাবি আদায়ে ২০২৩ সালের পাঁচই মে ঢাকার মতিঝিলেন শাপলা চত্বরে বড় সমাবেশও করে সংগঠনটি।

সেই সমাবেশ ঘিরে হেফাজতে ইসলাম এবং তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই সমাবেশ পণ্ড করতে গেলে একপর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

যদিও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে হেফাজতের সখ্যতাও হতে দেখা গেছে। এমনকি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমানের মর্যাদা শেখ হাসিনার আমলেও দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনার পর কওমি মাদ্রাসার আলেমদের একটি অংশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিও দিয়েছিল।

কিন্তু পরে নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ দেখা দিলে হেফাজতে অনেক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হতে দেখা যায়। রোববার সেসব মামলা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সেইসঙ্গে, এবার তারা সরকার পরিচালনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলেম-ওলামাদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার দাবিও তুলেছে।

সংগঠনটি মনে করে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বাংলাদেশের সমাজে আলেমদের একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। ফলে ইসলামী পণ্ডিতরা সরকারে থাকলে দেশের মানুষ উপকৃত হবে।

“এদেশের আলেম সমাজ সবসময় অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ফলে তারা যদি সরকারে থাকে, তাহলে সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজ এবং যারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চক্রান্ত করছে, তাদের মোকাবিলা করে সরকারকে সঠিক পথে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবে। এটার জন্য আমরা মনে করি, সরকার পরিচালনায় আলেমদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি,” বলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখালেও হেফাজত ঠিক কোন ধরনের ইসলামি পণ্ডিতদের অংশ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে এবং তাদের ভূমিকা কেমন হবে?

“আমরা এ বিষয়টা কোনো সুনির্দিষ্টভাবে বলিনি। সরকার যদি ইচ্ছা করে তাহলে রাষ্ট্রের যেকোনো কাজে দেশের শীর্ষ ওলামায়ে-একরামদের সাথে যেমন মতবিনিময় ও পরামর্শ করতে পারেন এবং তাদের চয়েসকেও (পছন্দ) কাজে লাগাতে পারেন,” বলেন মি. ইসলামাবাদী।

রোববার বিকেলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী

ছবির উৎস, Hefazat e islam bangladesh

বিএনপি সরকার কী চাচ্ছে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় হেফাজতে ইসলামের নেতারা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছেন এবং দাবি পূরণের আশ্বাসও পেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

কিন্তু বিএনপি সরকার হঠাৎ কেন হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিলো? তাদের কাছে আসলে কী চায় সরকার?

বিএনপি বলছে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে তাদের ‘সুসম্পর্ক’ বেশ দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলন থেকে শুরু করে সবশেষ সংসদ নির্বাচনেও সংগঠনটিকে পাশে পেয়েছেন বলে জানাচ্ছেন নেতারা।

“ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন- এই সমস্ত বিষয়গুলোয় তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। তাদের কর্মসূচিতে আমরা সমর্থন দিয়েছি, তারাও আমাদের সমর্থন করেছে। এভাবে আমরা চলছি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।

এই ‘সুসম্পর্কে’র জায়গা থেকেই বিএনপি আশা করছে যে, আগামীদিনেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে তারেক রহমানের সরকারের পাশে থাকবে হেফাজতে ইসলাম।

“আমরা প্রত্যাশা করি যে, এখন যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজমান আছে, এই পরিবেশ যেন কন্টিনিউ করে এবং সরকার যে ইতিবাচক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করছে নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে, এই কর্মযজ্ঞের প্রতি তাদের সমর্থন থাকবে,” বলেন মি. রিজভী।

এদিকে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্টতা সন্দেহের চোখে দেখছেন বিরোধীদলে থাকা জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।

সবশেষ সংসদ নির্বাচনে হেফাজতের একাংশ জমিয়ত উলামায়ে বাংলাদেশ বিএনপিকে সমর্থক দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়।

নতুন সরকার গঠনের পর হেফাজতের উদ্যোগে কওমি ধারার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্প্রতি একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন যে, ‘নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব কমানো’র লক্ষ্যেই তারা বৈঠকটটি করেছেন।

তবে জামায়াত নেতাদের অনেকে মনে করেন, তাদের ১১ দলীয় জোট থেকে কওমি ধারার দলগুলোকে বের করে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে বৈঠকটি করা হয়েছে এবং এটার পেছনে সরকারের হাত রয়েছে।

“আমাদের মনে হয়, এটা বিএনপি ও সরকারের ষড়যন্ত্র,” গত ১৯শে জুলাই বিবিসি বাংলাকে বলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

যদিও বিএনপি নেতারা অবশ্য জামায়াতের এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছেন।

“সরকার কেন ষড়যন্ত্র করতে যাবে! কওমি ধারার যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তারা কি সবাই বোকা? অবশ্যই না। সুতরাং তারা নিজেরা চিন্তা-ভাবনা করে, ভালো-মন্দ বিচার করে যদি একটা সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে কারই-বা কী বলার আছে?,” বলছিলেন বিএনপি নেতা মি. রিজভী।