Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
চার লাখের বেশি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জমা পড়েছে ১৩ লাখের কাছাকাছি আবেদন। জিপিএ-৫ পাওয়া ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীও রয়েছেন এই তালিকায়।
পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষা বা পুনরায় মূল্যায়নের জন্য এই আবেদন করেছেন এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট ও সমমানের শিক্ষার্থীরা।
এত বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর খাতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদনের বিষয়টি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে কত সময় লাগতে পারে এই বিষয়টিও সামনে আসছে।
এছাড়া এবার যেহেতু খাতা পুনঃনিরীক্ষার বদলে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, সেক্ষেত্রে নম্বর বৃদ্ধির পাশাপাশি, কমতেও পারে কিনা, এমন প্রশ্নও উঠছে।
শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, প্রতিবছরই পরীক্ষার খাতা পুনঃনিরীক্ষার আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু বোর্ড পরীক্ষায় এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর খাতা চ্যালেঞ্জের ঘটনা এবারই প্রথম।
এসএসসির খাতা পুনরায় মূল্যায়নে আবেদনের সংখ্যা নিয়ে বিস্ময় জানিয়েছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রীও।
তিনি বলছেন, “দেখে মনে হচ্ছে যেন সকলেই খাতা মূল্যায়ন করতে চায়। মানে আমাকে আবার ২০ লক্ষ শিক্ষার্থীর খাতা প্রত্যেকটিই দেখতে হবে। ইট ইজ কোয়াইট ইমপসিবল।”
ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কথাও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
এ বছর খাতা পুনঃনিরীক্ষার বদলে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ায় অতীতের তুলনায় আবেদন বেশি পড়েছে বলেই মনে করে করা হচ্ছে।
তবে, এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নে আবেদনের যে সংখ্যা, সেটি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে বলেই মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের অনেকে।
শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ে দেশের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
তারা বলছেন, বাংলাদেশে যেভাবে লিখিত পরীক্ষা নিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে পাস-ফেলের হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেটি যথার্থ নয়।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
এত আবেদন কেন?
“উচ্চতর গণিতে পেয়েছি ৭২, পদার্থবিজ্ঞানে ৭৮ আর বায়োলজিতে ৭১- এই তিনটাতেই আবেদন করছি। পরীক্ষা তো ভালো দিছিলাম, ফিজিক্স আর বায়োলজিতে তো এ-প্লাস মিস হওয়ার কথা না।”
বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন এ বছর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পাস করা কুমিল্লার শিক্ষার্থী ওয়াহিদুল ইসলাম।
পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার আশা থাকলেও চূড়ান্ত ঘোষণায় তার রেজাল্ট এসেছে জিপিএ-৪ দশমিক ৭৮। ফলে, তিন বিষয়ের খাতা পুনরায় মূল্যায়নের আবেদন করেছেন এই শিক্ষার্থী।
তার মতো অনেক শিক্ষার্থীই প্রতিবছর পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের আবেদন করেন। যেখানে কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি থাকেন অকৃতকার্যরাও।
তাহলে এ নিয়ে এবার এত আলোচনার কারণ কী?
বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে কখনই খাতা পুনঃনিরীক্ষার জন্য এত বেশি আবেদন পড়েনি। বিশেষ করে জিপিএ-৫ পাওয়া ত্রিশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর, খাতা পুনঃনিরীক্ষার আবেদন অবাক করেছে তাদেরকেও।
“এমনও আবেদিন আমরা পেয়েছে যে, একটি বিষয়ে একশর মধ্যে ৯৮ পেয়েও আবেদন করেছে, এখানে আসলে কেন সে আবেদন করেছে, কী বলবো,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।
এ বছর এসএসসির উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের আবেদন বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে দুটি বিষয়কে মূল কারণ হিসেবেই দেখছেন শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিবছর খাতা মূলত পুনর্নিরীক্ষণ হয়, অর্থাৎ খাতার কোনো প্রশ্ন বাদ গেছে কিনা, নম্বর যোগে ভুল হয়েছে কিনা, ওএমআর শিটে সঠিকভাবে নম্বর উঠেছে কিনা- এই বিষয়গুলো দেখা হতো।
কিন্তু এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় খাতা পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে। অর্থাৎ আবেদন করা খাতা এবার নতুন করে যাচাই হবে।
এছাড়া এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্যের সংখ্যাও গত ১৯ বছরের মধ্যে সব থেকে বেশি। ফলে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীরাও বেশি আবেদন করেছেন।
উল্লেখ্য, গত দশই অগাস্ট প্রকাশিত ফলাফলে, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার গড়ে পাস করেছে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ শিক্ষার্থী; কমেছে জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে রেজাল্টের অবস্থা আরও খারাপ।
ছবির উৎস, Sangsad TV
চাপে শিক্ষা বোর্ডগুলো
এসএসসির গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির প্রস্তুতি বা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন শিক্ষার্থীরা।
যদিও এ বছর এসএসসির খাতা পুনঃনিরীক্ষার অধিক আবেদন এবং মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শিক্ষা কার্যক্রমকে পিছিয়ে দেয় কিনা, এমন শঙ্কা তৈরি করেছে।
খাতা মূল্যায়নের কাজটি শেষ করতে অবশ্য খুব বেশি সময় নিতে চায় না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেপ্টেম্বর মাসের দশ তারিখের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করার একটি নির্দেশনাও বোর্ডগুলোকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্মূল্যায়ন দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোকে বেশ চাপে ফেলেছে বলেই মনে হচ্ছে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে খাতা মূল্যায়নের জন্য গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী বলছেন, নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে এবার অতীতের তুলনায় অধিক সংখ্যক নিরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
“আমাদের খাতাগুলো এখনও আসতেছে, আমরা প্রতি দুইশ খাতার জন্য তিনজন পরীক্ষককে দায়িত্ব দিব। দুইজন দুইশ খাতা দেখবে এবং একজন সেটা পুনর্মূল্যায়ন করবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
অনেকটা একই অবস্থা অন্য বোর্ডগুলোতেও। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ২ লক্ষ ৭৮ হাজার খাতা পুনরায় মূল্যায়নের আবেদন জমা পড়েছে।
“আগের তুলনায় আবেদনের সংখ্যা বেড়েছে। তবে এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আগের বছর এই আবেদন নিষ্পত্তির জন্য ২০৯ জন টিচার কাজ করেছেন, এবার হয়ত পাঁচশ জন কাজ করবেন,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ।
ছবির উৎস, Getty Images
নম্বর কি কমতে পারে?
‘খাতা চ্যালেঞ্জ’ শুনলেই মনে করা হয় যে, একজন শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র হয়ত নতুন করে যাচাই করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
নীতিমালা অনুযায়ী, উত্তরপত্র পুনরায় নিরীক্ষণ করা হতো, পুনর্মূল্যায়ন নয়। অর্থাৎ, শিক্ষক খাতায় ঠিক নম্বর দিলেন কি না, সেটি দেখার সুযোগ ছিল না।
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তরপত্র নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন বাদ গেছে কিনা, নম্বর যোগে ভুল হয়েছে কিনা, ওএমআর শিটে সঠিকভাবে নম্বর উঠেছে কিনা- মূলত এই বিষয়গুলোই দেখা হতো।
কিন্তু এবার যেহেতু খাতা পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে, ফলে চ্যালেঞ্জ করা খাতায় কোনো প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে কম-বেশি দেওয়া হয়েছে কিনা, সেটিও দেখা হবে।
এক্ষেত্রে খাতা মূল্যায়নে কোনো শিক্ষার্থীর নম্বর যদি বাড়তে পারে, তাহলে কারো নম্বর কি কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে? এমন প্রশ্নও করছেন কেউ কেউ।
কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে নম্বর কমানো যাবে কিনা এমন কোনো নির্দেশনা এখনও তারা পাননি।
তবে “এরকম হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ একটাতো রেজাল্ট ঘোষণা হয়েছে, নম্বর কম হয়েছে কিনা সেটা আমরা দেখতে পারি, যেটা অতীতে পুনঃনীরিক্ষণের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এবছর উত্তরপত্র মূল্যায়নে নম্বর কমার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করেন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, “পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নে ভবিষ্যতে যে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে হয়ত এ বিষয়ে নির্দেশনা আসতে পারে। কিন্তু এবার নম্বর কমবে না।”
ছবির উৎস, Getty Images
মূল্যায়নে গলদ কোথায়?
এ বছর এসএসসির উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষায় বেশি আবেদন জমা পড়ার পর এ নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা মূলত আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা এবং দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৮০ এর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালা অনুযায়ী উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষার সুযোগ থাকালেও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নেই।
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন যে, এবারের অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে।
তিনি বলেন, “যে ১২ লাখের বেশি আবেদন হয়েছে, সেটি রিচেক করে তারপর কলেজে অ্যাডমিশন দিতে হবে। এটা একটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।”
ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নের আবেদন করতে হলে কোন বিয়ষগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে সেটি নীতিমালায় উল্লেখ থাকবে।
“কোন ধরনের খাতাগুলো রিএক্সামিন হতে পারে। আমরা ওই খাতাগুলোকেই অ্যাড্রেস করবো যেগুলোতে সিভিয়ারলি প্রবলেম,” বলেন তিনি।
এছাড়া যে-সব শিক্ষক খাতা দেখছেন, তাদের জবাবদিহির বিষয়টিও নীতিমালায় উল্লেখ থাকবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
“তারা কি আদৌ কোয়ালিফাইড, তারা ঠিকমতো খাতা দেখছেন কিনা, আন্ডার মার্কিং করছে কিনা-ওভার মার্কিং করছে কিনা- তাদেরকে এড্রেস করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে, ইট ইজ হিউজ টাস্ক,” বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৮০ অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে-কোনো পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র যদি কেউ অতিরিক্ত (ওভার মার্কিং) বা কম মূল্যায়ন (আন্ডার মার্কিং) করে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, কিংবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।
তবে এক্ষেত্রে, তৃতীয় কোনো পরীক্ষক যদি অতিরিক্ত বা কম মূল্যায়নের বিষয়টি নির্ধারণ না করেন, তাহলে এই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে দণ্ডিত করা যাবে না।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা অবশ্য বলছেন, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নীতিমালা এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও স্থায়ী ব্যবস্থা নয়।
এছাড়া দেশের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আব্দুস সালাম।
তিনি বলছেন, তাত্ত্বিক পরীক্ষা নির্ভর যে মূল্যায়ন পদ্ধতি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে, তাতে একজন শিক্ষার্থীর যথার্থ মূল্যায়ন কখনই সম্ভব নয়।




