Home LATEST NEWS BANGLA প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র মনুস্মৃতি নিয়ে কী বলেছেন রাহুল গান্ধী, কেন ক্ষুব্ধ বিজেপি?

প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র মনুস্মৃতি নিয়ে কী বলেছেন রাহুল গান্ধী, কেন ক্ষুব্ধ বিজেপি?

3
0

Source : BBC NEWS

মনুস্মৃতিতে আদর্শ নারীর সংজ্ঞাকে সমালোচনা করেছেন রাহুল গান্ধী

ছবির উৎস, ANI

Published

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র মনুস্মৃতিতে নারীদের যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, তার সমালোচনা করেছেন কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি অভিযোগ তুলেছে যে মি. গান্ধী ভারতীয় সংস্কৃতির অবমাননা করেছেন।

মহারাষ্ট্রের পুনেতে কংগ্রেস এমপি ও লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী শনিবার ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ অর্থাৎ, ‘ছাত্রদের কণ্ঠস্বর’ কর্মসূচিতে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র মনুস্মৃতির উল্লেখ করেন।

রাহুল গান্ধী মনুস্মৃতিতে নারীদের সম্পর্কে লেখা একটি উদ্ধৃতিকে লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করেন।

রাহুল গান্ধীর মনুস্মৃতি নিয়ে এই উদ্ধৃতির তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজেপির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা-মন্ত্রী।

কি বলেছেন রাহুল গান্ধী?

মহারাষ্ট্রের পুনের ওই অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধী বলে, “নারীরা কারও অধীনে থাকতে পারে না।”

তিনি বলেন, “একটি সমস্যা আছে এবং তা বেশ বড় সমস্যা। আমি যখনই পুরুষদের সঙ্গে কথা বলি, তখন দেখি নারীদের তিনটি বাক্সে রাখা হয়। নারীদের কন্যা, স্ত্রী অথবা মা হিসেবে দেখা হয়।”

“মা, স্ত্রী এবং কন্যা হিসেবে দেখায় কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু শুধু এটুকুই আপনার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না।”

রাহুল গান্ধী বলেন, “নারীরা পেশাজীবী, ক্রীড়াবিদ, নেতা, স্রষ্টা, উদ্যোক্তা এবং আরও অনেক কিছু। তবু পুরুষেরা তাদের এই তিনটি পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। এই তিনটি পরিচয়ই পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত। তা সে মা হোন, স্ত্রী হোন বা কন্যা হোন।”

রাহুল গান্ধী বলেন, “আমি এখানে মনুস্মৃতি থেকে একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই, যেখানে বলা হয়েছে, শৈশবে একজন নারীকে তার পিতার অধীনে থাকতে হবে। যৌবনে তাকে তার স্বামীর অধীনে থাকতে হবে এবং স্বামী মারা গেলে তাকে তার পুত্রদের অধীনে থাকতে হবে। একজন নারী কখনও স্বাধীন হতে পারেন না।”

তিনি দাবি করেন, “এই কথাগুলো সরাসরি মনুস্মৃতিতে লেখা আছে। এই শব্দগুলোর জন্য লজ্জা হওয়া উচিত। এই ধরনের কথা কখনও বলা উচিত ছিল না।”

২০২৫ সালে দিল্লিতে একটি বিক্ষোভে মনুস্মৃতি ও ভারতের সংবিধান হাতে এক বিক্ষোভকারী

ছবির উৎস, Yousuf Sarfaraz/SOPA Images/LightRocket via Getty Images

নারীদের নিয়ে মনুস্মৃতিতে কী বলা হয়েছে?

মনুস্মৃতির পঞ্চম অধ্যায়ের ১৪৮তম শ্লোকে নারীদের সুরক্ষা ও স্বাধীনতা নিয়ে একটি শ্লোক পাওয়া যায়।

এতে লেখা আছে, “একজন কন্যা সর্বদা তার পিতার সুরক্ষার অধীনে থাকবে, বিয়ের পর তার স্বামীই হবে তার অভিভাবক, স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে তার সন্তানদের দয়ার ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে, কোনও অবস্থাতেই একজন নারী স্বাধীন হতে পারে না।”

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক রাজীব লোচন জানিয়েছেন, মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে যে একজন পুরুষের কল্যাণের সঙ্গেই একজন নারীর কল্যাণ জড়িত।

তিনি জানান, “এই শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে কোনও পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মণদের সম্মান করা উচিত। কোনও নারীর কল্যাণ তখনই সম্ভব, যখন একজন পুরুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। একজন নারীর কোনও ধরনের ধর্মীয় অধিকার নেই। তিনি স্বামীর সেবা করে স্বর্গ লাভ করতে পারেন। মনুস্মৃতিতে এ ধরনের কথাই লেখা রয়েছে।”

রাজীব লোচন জানাচ্ছেন, কীভাবে পুরুষদের তুলনায় নারীদের গৌণ, তাও মনুস্মৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “কাউকে গৌণ বলা এক বিষয়, আর বাস্তবে তার গৌণ হওয়া আরেক বিষয়। তাই পুরুষদের সতর্ক করা হয়েছে যে পরিবারের সমস্ত সম্মান গৃহিণীর হাতে। তিনি রেগে গেলে অতিথিকে যথাযথভাবে আপ্যায়ন করবেন না এবং এতে পরিবারের কর্তার বড়সড় অসম্মান হবে। তাকে ঠিকভাবে না রাখলে তিনি অন্য কারও সঙ্গে পালিয়েও যেতে পারেন।”

বসুমতী সাহিত্য মন্দির, কলকাতা থেকে প্রকাশিত মনুস্মৃতির প্রামাণ্য সংস্করণ 'মনুসংহিতা'য় বিতর্কিত শ্লোক নম্বর ১৪৮

ছবির উৎস, Archive.org

মনুস্মৃতি কী? কেন বার বার বিতর্কের কেন্দ্রে আসে এই শাস্ত্র?

ইতিহাসবিদ নরহার কুরুন্দকর মনুস্মৃতি শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘স্মৃতি’ বলতে ধর্মশাস্ত্রকে বোঝায়।

তিনি বলেন, “সে ক্ষেত্রে মনুর রচিত ধর্মীয় শাস্ত্রকে মনুস্মৃতি বলা হয়। মনুস্মৃতিতে মোট ১২টি অধ্যায় রয়েছে, যার মধ্যে ২৬৮৪টি শ্লোক আছে। কিছু সংস্করণে শ্লোকের সংখ্যা ২৯৬৪।”

মি. কুরুন্দকর এ পর্যন্ত মনুস্মৃতি নিয়ে তিনটি বক্তৃতা দিয়েছেন। এই তিনটি বক্তৃতাকে একটি বইয়ের হিসাবে প্রকাশ করা হয়, যেখানে মনুস্মৃতির অন্তর্গত জগৎ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

মনুস্মৃতি সম্পর্কে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মি. কুরুন্দকর বলেন, “আমি তাদের মধ্যেই পড়ি, যারা মনুস্মৃতি পুড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে।”

মনুস্মৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মি. কুরুন্দকর বলেছিলেন, “এই শাস্ত্র রচনা খ্রিস্টের জন্মের দুই-তিনশো বছর আগে শুরু হয়েছিল। প্রথম অধ্যায়ে প্রকৃতির সৃষ্টি, চার যুগ, চার বর্ণ, তাদের পেশা এবং ব্রাহ্মণদের মাহাত্ম্যের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”

“দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রহ্মচর্য ও গুরুর সেবার কথা বলা হয়েছে।”

“তৃতীয় অধ্যায়ে বিবাহের বিভিন্ন ধরন, বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান এবং শ্রাদ্ধ অর্থাৎ পূর্বপুরুষদের স্মরণের বিবরণ রয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে গার্হস্থ্য জীবনের কর্তব্য, কী খাওয়া উচিত বা উচিত নয়, এবং ২১ ধরনের নরকের উল্লেখ রয়েছে।”

“পঞ্চম অধ্যায়ে নারীদের কর্তব্য, শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে একজন সন্ন্যাসীর এবং সপ্তম অধ্যায়ে একজন রাজার কর্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। অষ্টম অধ্যায়ে অপরাধ, বিচার, সাক্ষ্য এবং রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।”

“নবম অধ্যায়ে পৈতৃক সম্পত্তি, দশম অধ্যায়ে বর্ণ মিশ্রণ, একাদশ অধ্যায়ে পাপকর্ম এবং দ্বাদশ অধ্যায়ে তিন গুণ ও বেদের প্রশংসার কথা বলা হয়েছে। মোটামুটি এটাই মনুস্মৃতির সাধারণ রূপরেখা।”

“মনুস্মৃতিতে অধিকার, অপরাধ, সাক্ষ্য এবং বিচার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এটি বর্তমান সময়ের আইপিসি ও সিআরপিসির (বা দণ্ডবিধির) মতো করে রচিত।”

ড. বি আর আম্বেদকরের ছবি হাতে শোভাযাত্রায় বিজেপির সাবেক রাষ্ট্রীয় সাংগঠনিক প্রধান নীতিন নবীন

ছবির উৎস, ANI

কেন মনুস্মৃতি পুড়িয়েছিলেন ভারতের সংবিধান প্রণেতা বি আর আম্বেদকর?

ভারতের সংবিধানের মূল প্রণেতা ড. বি আর আম্বেদকর ১৯২৭ সালের ২৫ জুলাই মহারাষ্ট্রের কোলাবা জেলায় (বর্তমানে রায়গড়) মহাড়ে প্রকাশ্যে মনুস্মৃতি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।

নিজের বই ‘ফিলোসফি অব হিন্দুইজম’-এ তিনি লিখেছেন, “মনু চার বর্ণভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।”

তিনি বলেন, “মনু এই চার বর্ণকে পৃথক রাখার কথা বলে জাতিভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তবে এটা বলা যায় না যে মনুই জাতি ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু তিনি অবশ্যই এই ব্যবস্থার বীজ বপন করেছিলেন।”

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ

ছবির উৎস, ANI

মনুস্মৃতি নিয়ে বিজেপির অবস্থান

রাহুল গান্ধীর মনুস্মৃতি নিয়ে এই উদ্ধৃতির তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজেপির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা-মন্ত্রী।

একটি সভা থেকে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রাহুল গান্ধীর মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, “ভাই ছাড়া কি বোন হয়? স্বামী ছাড়া স্ত্রীর অস্তিত্ব থাকে? বা পুত্র ছাড়া কোনও মা কি তার অস্তিত্বকে পূর্ণ বলে মনে করেন? মনুস্মৃতি যদি এটা বলে থাকে তবে আপনারাই বলুন ঠিক বলেছে কি না।”

তিনি রাহুল গান্ধীর উদ্দেশ্যে আরও বলেন, “আপনি কেন আরবান নকশালদের হাতে ভারতের ভবিষ্যৎ ও সংস্কৃতিকে নষ্ট করতে চান?”

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং চৌহান সাংবাদিকদের বলেন, “রাহুল গান্ধীর না মনুস্মৃতি নিয়ে কোনও ধারণা আছে না হিন্দু ধর্মের জ্ঞান আছে।”

“দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে তার কোনও জ্ঞান নেই, গম ও যবের পার্থক্য ও গরু-বাছুরের পার্থক্য তিনি একবারের চেষ্টায় বলতে পারবেন না। তিনি নাকি এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।”