Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
আর্কটিক অঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ আগ্রহ নিয়ে আলোচনা তো রয়েছেই, এর মধ্যেই ভূমি কেনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের অতীত ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবছেন ইতিহাসবিদরা।
অতীতে “গ্রিনল্যান্ডের মতোই, ওয়াশিংটন দাবি করেছিল যে, এসব অঞ্চল অন্য শক্তির হাতে চলে যাওয়ার আগেই তাদের দখলে নেওয়া প্রয়োজন”, বলছিলেন মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জে সেক্সটন।
ট্রাম্পের যুক্তিতে, নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের “মালিকানা” প্রয়োজন।
যদিও একসময় প্রয়োজনে “কঠিন উপায়ে” তা করা হবে বললেও এখন তিনি “তাৎক্ষণিক আলোচনা” চান এবং “বলপ্রয়োগ করবেন না” বলে জানিয়েছেন।
এখানে, গত দুই শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ভূমি কেনার ঘটনা তুলে ধরা হলো।

লুইজিয়ানা কেনা (১৮০৩)
১৮০৩ সালে ফ্রান্সের কাছ লুইজিয়ানা ভূখণ্ড কেনার সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ ছিল।
নতুন গঠন হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২০ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত লুইজিয়ানার ভূমি কেনার ঘটনা ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সিদ্ধান্ত দেশটিকে সম্প্রসারণশীল মহাদেশীয় শক্তি হওয়ার পথেও এগিয়ে দেয়।
উত্তর আমেরিকায় ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড ছিল লুইজিয়ানা। তবে ফরাসি নিয়ন্ত্রিত সেন্ট দোমিঙ্গ (বর্তমান হাইতি) দ্বীপে বারবার হওয়া দাস বিদ্রোহ এবং ব্রিটেনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের হুমকি থেকেই শেষ পর্যন্ত ফরাসি নেতা নেপোলিয়ান বোনাপার্ট অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন।
ছবির উৎস, Getty Images
সেই সময়ের লুইজিয়ানা বর্তমান অঙ্গরাজ্যের তুলনায় অনেক বড় ছিল। মিসিসিপি নদী থেকে রকি পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত বর্তমানের ১৫টি অঙ্গরাজ্য সেই ভূখণ্ডের অংশ ছিল।
জেফারসনের বিশেষ লক্ষ্য ছিল দেশটির পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণ। একে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বলে মনে করতেন। ফলে বিশাল এই ভূখণ্ডের মালিকানা পাওয়া তাকে সেই সুযোগ করে দেয়।
১৮০৩ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকান ও ফরাসি সরকার একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র লুইজিয়ানার জন্য এক কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করে, যার পরিমাণ বর্তমান মূল্যে ৪০০ কোটি ডলারেরও বেশি।
এই বিশাল ভূখণ্ড অধিগ্রহণের ফলে নবগঠিত রাষ্ট্রটির আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মেক্সিকোর স্বত্বত্যাগ (১৮৪৮)
১৮৪০ সাল নাগাদ আমেরিকান জনসাধারণের বড় একটি অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শেষ পর্যন্ত তাদের “ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি” বা পূর্বনির্ধারিত নিয়তিই হলো পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া। তাদের এই সম্প্রসারণ ঘটেছিল মেক্সিকোর ক্ষতির বিনিময়ে।
ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণের অন্যতম জোরালো সমর্থক ছিলেন প্রেসিডেন্ট জেমস কে পোল্ক। ১৮৪৫ সালে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে টেক্সাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বিরোধের অংশ হন তিনি। টেক্সাস ১৮৩৬ সালে মেক্সিকোর কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।
১৮৪৫ সালে ওয়াশিংটন টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রে সংযুক্ত করে, যা পরবর্তী সময়ে দেশটির অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। পরের বছর, আমেরিকান ও মেক্সিকান সেনাদের মধ্যকার সংঘর্ষের পর কংগ্রেস মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অনুমোদন দেয়। তবে সংঘাতের কারণ ছিল আরও গভীর।
ইতিহাসবিদ জে সেক্সটনের ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল, যা তখন মেক্সিকোর অংশ ছিল এবং সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর থাকায় তা এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্যে লোভনীয় এবং আমেরিকার অন্যতম অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হতো।”
তবে, সেক্সটনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো মেক্সিকান সরকারেরই ক্যালিফোর্নিয়া বিক্রিতে রাজি হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার আশা ছিল না।
ফলে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়।
ছবির উৎস, Getty Images
যুদ্ধে আমেরিকার বিজয়ের পর ১৮৪৮ সালে দুই দেশ গুয়াদালুপ হিডালগো চুক্তি করে।
ওয়াশিংটন ওই ভূখণ্ডের জন্য এক কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমান। এর মধ্যে বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাডা ও ইউটাহর পাশাপাশি অ্যারিজোনা, কলোরাডো, নিউ মেক্সিকো ও ওয়াইওমিংয়ের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে জে সেক্সটনের ভাষায়, মেক্সিকো যুদ্ধে না হারলে এই চুক্তিতে রাজি হতো না। “এটি ছিল বন্দুকের মুখে বিক্রি করা,” বলেন তিনি।
মোটের ওপর, মেক্সিকো যুদ্ধের আগে থাকা ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি ছেড়ে দেয়, আর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা অর্জন করে।
লা মেসিলা বিক্রি (১৮৫৩)
১৮৪৮ সালে মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। ১৮৫৪ সালে চূড়ান্ত হওয়া এক চুক্তিতে দুই দেশের সরকার মেক্সিকোর দক্ষিণের একটি ছোট ভূখণ্ড বিক্রিতে সম্মত হয়, যা পরে অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকোর অংশ হয়।
মেক্সিকোতে ‘ভেন্তা দে লা মেসিলা’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাডসডেন ক্রয় নামে পরিচিত এই চুক্তির পেছনে আংশিকভাবে আমেরিকার আন্তঃমহাদেশীয় রেলপথ নির্মাণের আগ্রহ আর মেক্সিকো সরকারের অর্থনৈতিক সংকটও ফ্যাক্টর ছিল।
প্রায় ৭৬ হাজার ৯০০ বর্গকিলোমিটার ভূমির জন্য মার্কিন সরকার এক কোটি ডলার পরিশোধ করে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৪২ কোটি ১০ লাখ ডলারের সমান। এই ভূখণ্ডই পরবর্তী সময়ে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের অংশ হয়ে ওঠে।
রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা ক্রয় (১৮৬৭)
১৮৬৭ সালে রুশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে আর্কটিকের দূরবর্তী ভূখণ্ড আলাস্কা কেনার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সিওয়ার্ডের তীব্র সংকল্পের কারণ অনেকেই বুঝতে পারেননি।
সিওয়ার্ড বিশ্বাস করতেন, এই ভূমির কৌশলগত মূল্য অনেক। এটি একদিকে ব্রিটিশদের উত্তর আমেরিকায় হস্তক্ষেপ করা থেকে নিরুৎসাহিত করবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রশান্ত মহাসাগরের সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদে প্রবেশাধিকার দেবে।
আর রাশিয়া ভাবছিল, তারা এমন একটি ভূখণ্ড থেকে মুক্তি পাচ্ছে যার মূল্য কম, পরিচালনার খরচ বেশি এবং সে সময়কার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য হামলার মুখে ঝুঁকিপূর্ণ।
ছবির উৎস, Al Drago / Getty
রাশিয়ার কাছ থেকে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই ভূখণ্ড ৭২ লাখ ডলারে কেনার চুক্তি করেন সিওয়ার্ড। যা বর্তমান মূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তবে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকান জনমনে সেভাবে সাড়া ফেলেনি।
সমালোচকেরা এই চুক্তিকে ব্যঙ্গ করে ‘সিওয়ার্ডের বোকামি’ বলে ডাকতে শুরু করেন। অনেকের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র মূল্যহীন এক টুকরো জমি কিনেছে।
তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করে এবং আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায়, যদিও ১৯৫৯ সালের আগ পর্যন্ত এটি অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা পায়নি।
পরবর্তী সময়ে আলাস্কায় সোনা ও বিপুল তেলভাণ্ডার আবিষ্কারের মাধ্যমে সিওয়ার্ডের এই বিনিয়োগ সার্থক প্রমাণিত হয়। পাশাপাশি স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাজ্যটি বাড়তি সামরিক গুরুত্বও পায়।
ছবির উৎস, Getty Images
ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ কেনা (১৯১৭)
যুক্তরাষ্ট্র সবশেষ ভূখণ্ডটি কিনেছিল ডেনমার্কের কাছ থেকে। সেসময় ‘ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামে পরিচিত এই ভূখণ্ড ছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি, যা উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই মার্কিন কৌশলবিদদের আগ্রহের কেন্দ্র ছিল।
আবারও একে শান্তিপূর্ণ সম্প্রসারণ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন উইলিয়াম এইচ সিওয়ার্ড।
ছবির উৎস, Sean Gallup/Getty
বর্তমান ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের অন্তর্গত তিনটি প্রধান দ্বীপের একটি সেন্ট থমাসের বন্দর বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। এর একটি কারণ ছিল, বন্দরটিকে ক্যারিবীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য আদর্শ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
এদিকে প্রায় একই সময়ে ডেনমার্ক দ্বীপগুলো নিয়ে আগ্রহ হারাতে শুরু করে।
আগে সেখানে তারা বিশাল আখের বাগান গড়ে তুলেছিল, যেখানে ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আনা আফ্রিকান দাসরা কাজ করতো। কিন্তু বিশ্ববাজারে চিনির দাম কমতে শুরু করলে এসব বাগান ধরে রাখার ব্যাপারে ড্যানিশদের উৎসাহও কমে যায়।
১৮৬৭ সাল নাগাদ দুই দেশ ৭৫ লাখ ডলারে দুটি দ্বীপ বিক্রির প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছায়, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। তবে মার্কিন কংগ্রেস চুক্তিটি অনুমোদন না করায় তা শেষ অব্দি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
ছবির উৎস, Getty Images
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু এবং জার্মান সাবমেরিন মার্কিন জাহাজের জন্য হুমকি হয়ে উঠলে দ্বীপটির প্রতি আবারও আগ্রহ জন্মায় ওয়াশিংটনের। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, জার্মানি ডেনমার্ক আক্রমণ করে দ্বীপগুলো এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট থমাস বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট উইড্রু উইলসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেনমার্ককে সতর্কবার্তা দেন যে যদি তারা ভূখণ্ড বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে সম্ভাব্য দখল ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রই দ্বীপগুলো দখল করতে পারে।
ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যাস্ট্রিড অ্যান্ডারসেনের মতে, ইউএস ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ঘটনার সাথে আধুনিক সময়ের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।
“এখানে আজ আমরা গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কে যা শুনছি তার প্রতিধ্বনি রয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র মূলত যা বলতে এসেছিল তা ছিল- ‘হয় তুমি এটা আমাদের কাছে বিক্রি করবে, নয়তো আমরা আক্রমণ করব’,” বলেন তিনি।
অবশেষে ১৯১৭ সাল নাগাদ দুই পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। এর আওতায় ক্যারিবীয় দ্বীপগুলো দুই কোটি ৫০ লাখ ডলারে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৬৩ কোটি ডলারের সমান, তা যুক্তরাষ্ট্র কিনে নেয়।




