Home LATEST NEWS BANGLA আর্জেন্টিনার কাছে ‘হারার পরও জয়ী হয়েছে কেপ ভার্দে’

আর্জেন্টিনার কাছে ‘হারার পরও জয়ী হয়েছে কেপ ভার্দে’

2
0

Source : BBC NEWS

মেসি ও ভোজিনিয়া সবুজ মাঠে বলের দখল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পেছনে দর্শকভর্তি গ্যালারি

ছবির উৎস, Getty Images

কেপ ভার্দে হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশের প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল, কিন্তু তারা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, আর্লিং হালান্ড কিংবা হ্যারি কেইনকে ভুলিয়ে দিয়ে বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রথমবারের মতো এই টুর্নামেন্ট খেলতে আসা দলটি।

স্পেনের বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট অর্জনের পথে গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার বীরত্বগাঁথা ছিল। উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোলগুলোর পেছনে ছিল রোমাঞ্চ। আর ছিল সিডনি লোপেস কাবরালের দুর্দান্ত গোল, যার সুবাদে তারা প্রায় টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটিয়েই ফেলেছিল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ যাত্রায় যেন সবকিছুই ছিল।

মায়ামিতে অতিরিক্ত সময় শেষ হওয়ার বাঁশি বাজতেই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে হৃদয়ভাঙা ৩-২ গোলে হারের পর ব্লু শার্কসের খেলোয়াড়রা হতাশ হয়ে মাঠে লুটিয়ে পড়েন। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে পারেন এই জেনে যে, তারা অগণিত মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।

বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে স্কটল্যান্ডের সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার জেমস ম্যাকফ্যাডেন বলেন, “কেপ ভার্দে হেরেছে, কিন্তু তারা জয়ীও হয়েছে।”

তিনি বলেন, “তারা সাহস, একতা, পারস্পরিক সংহতি এবং নিজেদের পরিচয় ও সামর্থ্যের প্রতি অটল বিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছে।”

“এই টুর্নামেন্টের গল্পই হচ্ছে কেপ ভার্দে। একটি ফুটবল দলের মধ্যে আপনি যা দেখতে চান, তারা তা-ই দেখিয়েছে।”

বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে ৬৭তম অবস্থানে থেকে তারা টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। তবে গ্রুপ পর্বে তিনটি ড্র– যার মধ্যে প্রথম ম্যাচে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রাখা ছিল অন্যতম, তাদের সামনে এমন এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেয়, যেখানে তারা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটানোর চেষ্টা করেছিল।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তারা প্রথমে মেসির গোলে পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু পরে সমতায় ফিরে আসে এবং ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায়। এরপর আবারও পিছিয়ে পড়ে তারা—তবে কাবরালের দুর্দান্ত এক শটে আবারও সমতা ফেরে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা যথেষ্ট হয়নি।

ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড ডিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে দিক বদলে জালে জড়িয়ে গেলে আর্জেন্টিনা জয় নিশ্চিত করে।

তবে ইংল্যান্ডের সাবেক রাইট-ব্যাক গ্যারি নেভিল আইটিভিকে বলেন, এটি ছিল “একজন আন্ডারডগ দলের কাছ থেকে দেখা সবচেয়ে মহান পারফরম্যান্সগুলোর একটি”।

তিনি আরও বলেন, “তারা কাঁদছে কারণ তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।”

“তারা বাড়ি ফিরতে চায় না। তারা চায় এখানে থাকতে—জীবনের বাকি সময়টুকু।”

“তারা চায় যেন চিরকাল এখানেই থাকতে পারে। এই মুহূর্তটি সম্ভবত এই খেলোয়াড়দের কারও কারও জীবনে আর ফিরে আসবে না। এটি যেমন জাদুকরী, তেমনি বেদনাদায়কও।”

কেপ ভার্দের পতাকা ওড়াচ্ছেন দলটির গোলকিপার

ছবির উৎস, Getty Images

‘মানচিত্রে কেপ ভার্দে কোথায়, এখন আর কেউ জিজ্ঞাসা করে না’

হার সত্ত্বেও কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা গর্বে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কারণ তার দল আর্জেন্টিনাকে টাইব্রেকারে নিয়ে যেতে পারার মাত্র ১০ মিনিট দূরত্বে পৌঁছে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, “আমরা দেখিয়েছি যে আমরা হয়তো একটি ছোট দেশ, কিন্তু বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে খেলতে পারি। এটি গর্ব করার মতো একটি কারণ।”

“আমরা আমাদের দেশের জন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তারা গর্বিত হতে পারে।”

“বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আমরা যেভাবে খেলেছি এবং দুইবার সমতায় ফিরেছি, সেটি অবিশ্বাস্য কিছু।”

শামরক রোভার্সের সেন্টার-ব্যাক রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস, যিনি বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের চারটি ম্যাচেই খেলেছেন, বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, “এই বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি হলো, এখন আর কেউ মানচিত্রে কেপ ভার্দে কোথায় আছে তা জিজ্ঞেস করে না।এটাই আমাদের জন্য এক ধরনের ইতিহাস। আমরা নিজেদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছি।”

“আমরা একটি ছোট জাতি, কিন্তু আমাদের হৃদয় বড়। আমরা দেখিয়েছি কী সম্ভব, আর আপনি যদি বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি সফল হতে পারেন।”

গাঢ় নীল জার্সি পরা কেপ ভার্দের দুইজন ফুটবলার। একজন আরেকজনের কাঁধে উঠে আছেন

ছবির উৎস, Getty Images

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ৪৮ দলের বিশ্বকাপে সম্প্রসারণ ছিল আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে নেভিল বলেন, তিনি “আর কখনও সংশয়বাদী হবেন না”।

সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট, আইটিভিতে কথা বলতে গিয়ে, কেপ ভার্দের মতো আরো গল্প তুলে আনতে ফিফাকে সহায়তা করার আহ্বান জানান।

রাইট বলেন, “আপনি আসলে চাইবেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন ঘটনাই ঘটুক। আর এ কারণেই ফিফাকে অনেক কিছু করতে হবে, যাতে তারা যে অর্থ পায় তা সত্যিই সবার কাছে পৌঁছায়।”

“এটি মানুষকে দেখায় যে যখন আপনি কাউকে সুযোগ দেন, তখন তারা যত ছোটই হোক না কেন, সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছাতে পারে এবং তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে, বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।”

“তাদের এই প্রচেষ্টা ছিল সত্যিই অসাধারণ।”

গোলপোস্টের পেছনে থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি গোল ঠেকাচ্ছেন কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

কোথায় ছিলেন ভোজিনিয়া!

স্পেনের বিপক্ষে উদ্বোধনী গ্রুপ ম্যাচে গোল না খেয়ে দলকে ড্র এনে দেওয়ার পর ভোজিনিয়ার অশ্রুসিক্ত মুখ এবং পরে গর্বের সঙ্গে মাথার ওপরে কেপ ভার্দের পতাকা তুলে ধরা ছবিটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব দ্রুতই তাকে ভক্তদের প্রিয় এক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তবে তার জনপ্রিয়তার কারণ শুধু ওই ছবি বা তার আবেগ নয়। মাঠে তার পারফরম্যান্সের মান তাকে সুপারস্টারের মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে।

৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের বর্তমানে কোনো ক্লাব নেই। পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের দল শাভেসের সঙ্গে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

তবে নেভিল মনে করেন না যে এই গোলরক্ষককে বেশিদিন ক্লাবহীন থাকতে হবে।

আইটিভিতে নেভিল বলেন, “এই বিশ্বকাপের পর ভোজিনিয়া অবশ্যই একটি ভালো ক্লাব পেতে যাচ্ছেন।”

“কি অসাধারণ একটি বিশ্বকাপ! তিনি যা-ই করেন, সবকিছুতেই থাকে স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাস। এতদিন তিনি কোথায় ছিলেন? আমাদের তো এর আগেই তার সঙ্গে পরিচয় হওয়া উচিত ছিল।”

রাইটও যোগ করেন যে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দের হয়ে তার পারফরম্যান্সের পর ভোজিনিয়ার মধ্যে “নায়কোচিত উদ্দীপনা” দেখা গেছে।

মায়ামিতে আটটি সেভ করার মাধ্যমে ভোজিনিয়া এবারের বিশ্বকাপ শেষ করেন মোট ১৮টি সেভ নিয়ে। এই তালিকায় তার চেয়ে বেশি সেভ করেছেন শুধু কুরাসাওয়ের এলয় রুম (২০) এবং প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল (১৯)।