Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলার কারণে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করছে।
তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজের চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
নৌবাহিনী সব জাহাজকে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছে, “হরমুজ প্রণালির কাছে আসবেন না; অন্যথায় আপনার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে”।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে বলে খবরের পর এ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি।
গতকাল এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে করা চুক্তি যাতে অব্যাহত সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে আশঙ্কার পর ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। তবে পরে এক মুখপাত্র জানান, তাদের বাহিনী “তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করতে কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে”।
হেজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, তারা শুক্রবার বিকেলে মার্কিন কর্মকর্তাদের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি স্বীকৃতি দেন না এবং লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলের অবাধ সামরিক কার্যক্রম চালানোর লক্ষ্যকে প্রত্যাখ্যান করছেন।
এর আগে আজ স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলায় ১৬ জন এবং পাশের সাইদা এলাকায় সাতজন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ওই অঞ্চলে তাদের বাহিনীর ওপর ৫০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর তারা হেজবুল্লাহর “ডজনখানেক” লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই আজ একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা চুক্তির তিন দিনের মাথায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের খবর এলো। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশই যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এই চুক্তিতে সই করেছেন বলে তেহরান নিশ্চিত করে।
তবে হরমুজ প্রণালি এখনো “সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত রয়েছে” বলে ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে ইরানি নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে ফিরিয়ে দিচ্ছে বলে যে তথ্য এসেছে, সে বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইরানিরা এখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে—এমন কোনো প্রমাণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না”।
তিনি আরও বলেন, “আমরা গতকাল হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করেছি। তাই আপনি দেখতে পাচ্ছেন, জাহাজগুলো চলাচল করছে”।
ছবির উৎস, Reuters
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তিটি শুরু থেকেই ছিল ভঙ্গুর এবং তা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াও ছিল জটিল। ইতোমধ্যে এর ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই প্রণালি আংশিকভাবে পুনরায় চালু হওয়াই ছিল সমঝোতা স্মারকের প্রধান সাফল্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ইরানের সামরিক বাহিনী বলছে, এটি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের “অবিরাম ও ধারাবাহিক” যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরান এ পদক্ষেপ নিয়েছে। ইসরায়েল এখনো দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশ দখলে রেখেছে।
এখন সব দৃষ্টি থাকবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দিকে— নিজেদের মিত্র ইসরায়েলের ওপর কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করেন, যাতে তারা লেবাননে সামরিক অভিযান নিয়ন্ত্রণে আনে, সেটা দেখার জন্য।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে হোয়াইট হাউসের নজিরবিহীন সমালোচনার এক সপ্তাহ পর এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
এদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আজ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বেড়ে যায় এবং ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এ পথ দিয়ে অতিক্রম করেছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী প্রণালিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার পর এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, “নৌপরিবহন স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী সংশ্লিষ্ট এলাকায় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় ২০শে জুন হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বেড়েছে”।
“আজ আন্তর্জাতিক এই জলপথ দিয়ে নিরাপদে চলাচল অব্যাহত ছিল; ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এ পথ অতিক্রম করেছে, যা বিপুল পরিমাণ পণ্য ও এক কোটি ৭০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল বৈশ্বিক বাজারে পরিবহন করেছে”।
এতে আরও বলা হয়, “ইরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তির সব দিক মেনে চলা, বাস্তবায়ন ও পূর্ণ কার্যকরতা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী উপস্থিত ও সতর্ক রয়েছে”।
ছবির উৎস, Reuters
‘সুইজারল্যান্ডে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে কাল’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২১শে জুন সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার পর এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই আলোচনায় পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরাও অংশ নেবেন এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে।
এতে আরও বলা হয়, আলোচনার লক্ষ্য হলো ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে অর্জিত “বোঝাপড়াগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া”।
এর আগে, এই সপ্তাহের শুরুতে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনাটি, যেখানে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অংশ নেওয়ার কথা ছিল, স্থগিত করা হয়।
হোয়াইট হাউস বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে, হেজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট লেবাননের গণমাধ্যম জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার কারণে আলোচনাটি স্থগিত করা হয়েছে।
ছবির উৎস, Reuters
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় তাদের উপস্থিতির লক্ষ্য থাকবে “অন্য পক্ষকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধ্য করা”।
“এই সপ্তাহের শুরুতে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ১, ৪, ৫, ১০ এবং ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন শুরু হয়ে তা অব্যাহত থাকলেই কেবল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি এমন নয় এবং আসন্ন আলোচনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে “চাপ” দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে কী ছিল
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো, যা ১৪টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গঠিত-
১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা;
২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে”;
৩. তারা “সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে”;
৪. অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র “তার নৌ অবরোধ প্রত্যাহার শুরু করবে’ এবং “৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নৌ অবরোধ শেষ করবে”;
৫. হরমুজ প্রণালিতে ইরান “৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের চার্জ ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে”;
৬. যুক্তরাষ্ট্র “আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য” কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি তহবিল;
৭. যুক্তরাষ্ট্র “ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে”;
৮. ইরান “পুনরায় নিশ্চিত করবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা উন্নয়ন করবে না”, তবে কর্মসূচির অন্যান্য অংশ এখনো আলোচনার বিষয়। দুই পক্ষ “সমৃদ্ধকরণ এবং ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে”;
৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত”;
১০. চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর এবং নিষেধাজ্ঞা উঠানো পর্যন্ত মার্কিন ট্রেজারি “ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সব সেবার রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র দেবে”;
১১. যুক্তরাষ্ট্র “ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করবে”;
১২. এই সমঝোতা স্মারকের “সফল বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি কার্যনির্বাহী ব্যবস্থাপনা গঠন করা হবে”;
১৩. চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর—১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর বিষয়ের বাস্তবায়নের শর্তে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে একচেটিয়াভাবে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু করবে”;
১৪. “চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে”।




