Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Jordan Teller/ISI Photos via Getty Images
বিশ্বকাপ মাঠের একদম মাঝামাঝি জায়গায় ও সবার সামনের সারির ছয়টি টিকিট, সঙ্গে ফাইনালের দিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সময় ঠিক যখন বিজয়ী দল ট্রফি তুলে নেবে, সেই সময় মাঠে প্রবেশের সুযোগ—এমন একটি প্যাকেজের দাম ছিল চার মিলিয়ন বা ৪০ লাখ ডলার; যেটি ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে বিক্রি হয়ে যায়।
এটি ছিল নাইটসব্রিজ সার্কেলের, যারা অতি ধনী গ্রাহকদের বিশেষ ধরনের সেবা দেয়, বিক্রি করা একটি অতিমাত্রায় বিলাসবহুল প্যাকেজের অংশ।
“টুর্নামেন্টের ইতিহাসে প্রথম” এ ধরনের এই সুযোগটি শুধু আমন্ত্রিত ক্লায়েন্টদের জন্য দেওয়া হয়েছিল। প্যাকেজটি দেওয়ার আগে অবশ্য তাদের মূল্যায়নও করা হয়।
নাইটসব্রিজ সার্কেলের প্রেসিডেন্ট স্টুয়ার্ট ম্যাকনিল বিবিসি নিউজ ব্রাজিলকে বলেন, “প্যাকেজটি ঘোষণার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে আমাদের একজন সদস্যের কাছে বিক্রি হয়ে যায়।”
বিশ্বকাপ দেখতে আগ্রহী অতি-ধনী ব্যক্তিদের জন্য বিলাসবহুল প্যাকেজ প্রদানকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাইটসব্রিজ সার্কেল একটি।
এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে এবং এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটি দেশে– যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়।
মোট ১৬টি শহরে ১০৪টি ম্যাচ হবে।
তবে এবার একেবারে কাছ থেকে বিশ্বকাপ দেখতে ইচ্ছুক বহু সমর্থকের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং যত্নসহকারে করা পরিকল্পনা নানা সমস্যায় ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ছিল টিকিট ও পরিবহনের উচ্চ মূল্য থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার জটিলতার মতোর বিষয়ও।
ছবির উৎস, Jetlinerimages via Getty Images
কিন্তু দর্শকদের একটি ক্ষুদ্র অংশের জন্য অভিজ্ঞতাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা ব্যক্তিগত জেটে আয়োজক শহরগুলোতে পৌঁছান, হেলিকপ্টার বা লিমোজিনে স্টেডিয়ামে যান এবং ভিআইপি এলাকায় তাদের জন্য জায়গা নিশ্চিত থাকে– এমনকি তারা শেষ মুহূর্তে খেলা দেখার সিদ্ধান্ত নিলেও এসব সুবিধা মেলে।
“আমি ২২ বছর ধরে এই (বিলাসবহুল) বাজারে কাজ করছি, আর এই বিশ্বকাপে আমার জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো– টাকায় এখন প্রায় সবকিছুই কেনা সম্ভব, যা নতুন একটি বিষয়,” বলেন ম্যাকনিল।
তিনি এবং উচ্চমানের বিলাসবহুল খাতের অন্য বিশেষজ্ঞরা বিশ্বকাপে এসব প্যাকেজ নিতে আগ্রহী ক্রেতাদের নাম প্রকাশ করেন না। তবে তিনি বলেন, এদের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার সেলিব্রিটি, বিলিয়নিয়ার, প্রতিষ্ঠাতা, প্রযুক্তি খাতের নির্বাহী এবং ক্রীড়াবিদরা আছেন।
খরচ কেমন?
বিশ্বকাপের সব বিলাসবহুল প্যাকেজের দাম মিলিয়ন ডলারে না হলেও, অনেক কাস্টমাইজড ভ্রমণসূচির খরচ “সহজেই ছয় অঙ্ক” ছাড়িয়ে যায়।
এগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত জেট ও হেলিকপ্টার থেকে শুরু করে ভিআইপি বিমানবন্দর সেবা, নিরাপত্তা দল এবং বিলাসবহুল হোটেলে থাকার ব্যবস্থা – সবই অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বিলাসবহুল ভ্রমণ সেবা দানকারী কোম্পানি ম্যাগমা গ্লোবালের অবকাশ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোল ওয়ালাকের মতে, দুই জনের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প—যার মধ্যে পাঁচ তারকা হোটেল, ম্যাচের টিকিট, বিজনেস ক্লাস ফ্লাইট এবং ব্যক্তিগত পরিবহন অন্তর্ভুক্ত—এর খরচ ২৫ হাজার ডলার থেকে ৭৫ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
কিছু গ্রাহক আরও বেশি অর্থ ব্যয় করেন এমন ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য, যাতে কয়েক দিন ধরে একাধিক আয়োজক শহর অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এমনও অনেকে আছেন, যারা বিশ্বকাপের সঙ্গে অন্যান্য গন্তব্যের ভ্রমণ যুক্ত করেন।
ওয়ালাক বিবিসি নিউজ ব্রাজিলকে বলেন, “আমার এমন ক্লায়েন্ট আছেন যারা লস অ্যাঞ্জেলেসে খেলা দেখে এরপর হাওয়াইয়ে কয়েক রাত কাটাতে উড়ে যান।”
ছবির উৎস, Tom Fox/The Dallas Morning News via Getty Images
ফাইনাল খেলা যে সপ্তাহে, তখন নিউ ইয়র্কে বিলাসবহুল থাকার ব্যবস্থা থাকলে, খরচ সহজেই ছয় অঙ্কে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংস্থা ফার্স্ট ইন সার্ভিস ট্র্যাভেল, যেটি বিলাসবহুল ভ্রমণ নেটওয়ার্ক ‘ভার্চুয়োসো’-এর অংশ, এর স্ট্র্যাটেজি ডিরেক্টর জিনা গ্যাবার্ড, বিবিসি নিউজ ব্রাজিলকে বলেন, অতি-ধনীদের জন্য ভিআইপি টিকিট ও ম্যাচ চলাকালে শেফদের রান্না করা খাবার থেকে শুরু করে আরও বিস্তৃত প্যাকেজ পর্যন্ত নানা বিকল্প রয়েছে।
“এগুলোতে খেলোয়াড়দের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে,” বলেন গ্যাবার্ড।
তিনি আরও বলেন, “ভিআইপি টিকিট, ম্যাচের ওপর নির্ভর করে, প্রতি ব্যক্তির জন্য পাঁচ হাজার ডলার থেকে শুরু হতে পারে। আর একাধিক ম্যাচ ও শহর অন্তর্ভুক্ত হলে প্যাকেজের দাম কয়েক লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।”
গোপনীয়তা ও প্রবেশাধিকার
ওয়ালাকের মতে, এই শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য টাকা খরচের চেয়ে সুবিধা, গোপনীয়তা ও প্রবেশাধিকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “তারা নিজস্ব লোকদের দল নিয়ে ভ্রমণ করেন এবং এমন বড় ইভেন্টে অত্যন্ত ব্যক্তিগতকৃত অভিজ্ঞতা আশা করেন।”
তবে কিছু ম্যাচে স্টেডিয়ামে যাওয়ার পরিবহনের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি হতে পারে।
“কী পরিমাণ বিমান পাওয়া যাবে তার সংখ্যা এবং অবতরণস্থলের সীমাবদ্ধতা আছে,” বলেন ওয়ালাক।
এ ক্ষেত্রে বিকল্প হলো ব্যক্তিগত চালকসহ বিলাসবহুল গাড়ি।
ওয়ালাকের মতে, এসব গ্রাহক শুধু ভিআইপি টিকিট চান না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সবাই সামনে বসতে চান না। অনেকের জন্য অগ্রাধিকার হলো গোপনীয়তা এবং একান্ত সেবায় প্রবেশাধিকার। তারা সম্পূর্ণ ভিআইপি অভিজ্ঞতা খোঁজেন।”
“যখন সাধারণ দর্শক সারিতে সময় নষ্ট করেন এবং সারাদিন খাবার-পানীয়ের জন্য অর্থ ব্যয় করেন, তখন এই গ্রাহকদের সাধারণত আলাদা প্রবেশপথ এবং ফাইন ডাইনিংসহ ব্যক্তিগত লাউঞ্জে প্রবেশাধিকার থাকে।”
ছবির উৎস, Getty Images
ওয়ালাক বলেন, এই ভ্রমণকারীরা কেবল সবচেয়ে দামি অভিজ্ঞতা চান– এমনটা ভাবাও ভুল।
“তারা চান ঝামেলামুক্ত অভিজ্ঞতা,” বলেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ভিড় এড়িয়ে চলা এবং সময়সূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার মতো বিষয়।
ম্যাকনিল বলেন, “তারা একচেটিয়া সুযোগ চান, অন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে চান না। এটি যেন লাল গালিচা সংবর্ধনার মতো এবং তারা এর জন্য অর্থ দিতে প্রস্তুত।”
এই গ্রাহকদের সঙ্গে ভ্রমণ করা সহায়ক দলগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী থেকে ব্যক্তিগত শেফ পর্যন্ত বিভিন্ন পেশাজীবী থাকতে পারেন।
গ্যাবার্ড বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে ট্রাভেল কনসালট্যান্ট সরাসরি ক্লায়েন্টের ব্যক্তিগত সহকারী এবং অন্যান্য দলের সদস্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে সব ব্যবস্থা সমন্বয় করেন।”
শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত
এই ভ্রমণকারীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—পূর্ব পরিকল্পনার অভাব। অর্থাৎ, তারা অনেক আগে থেকে এ ধরনের ভ্রমণ নিয়ে ভাবেন না।
ওয়ালাক বলেন, “তারা সময়কে অর্থের চেয়ে বেশি মূল্য দেন এবং প্রায়ই শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন।”
ম্যাকনিলের মতে, শুরুতে তার ক্লায়েন্টদের বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ তেমন ছিল না।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের ভ্রমণকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে প্রকৃত অনীহা ছিল।”
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় চাহিদা বেড়েছে এবং শেষ ষোলো পর্ব ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এবং কোন দেশগুলো এগোবে তা স্পষ্ট হওয়ায় এটি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ম্যাকনিল বলেন, “আসলে আমাদের জন্য এটি এখনই শুরু, কারণ আমরা যাদের সেবা দিই তারা প্রায়ই শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকেই ব্যক্তিগত জেটে ভ্রমণ করেন, তাই সব ম্যাচে যাওয়া তাদের জন্য সহজ।”
ওয়ালাক জানান, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি এসব প্যাকেজের চাহিদা বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছেন।
তিনি বলেন, “খোলাখুলি বললে, এটি আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।”
ম্যাকনিলের মতে, ম্যাচ ছাড়াও অন্যান্য একান্ত অভিজ্ঞতার জন্যও চাহিদা রয়েছে। যেমন তার প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত সাবেক বিশ্বকাপ খেলোয়াড়দের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলার সুযোগ থাকে।
কিছু ক্ষেত্রে, যারা তারকাদের কাছ থেকে দেখতে চান, তারা সেই খেলোয়াড়ের সমর্থিত দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
ম্যাকনিল বলেন, “অনেক খেলোয়াড় দাতব্য কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।”
“ছুটির দিনে তারা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কিছু ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হন। আমাদের ক্লায়েন্টরা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেন এবং হয়তো তারা খেলোয়াড়ের সঙ্গে ছবি তুলতে পারেন, বল নিয়ে একটু খেলতে পারেন—এ ধরনের কিছু।”
যারা বিশ্বকাপ ফাইনালের “অতিমাত্রায় একান্ত” অভিজ্ঞতা পেতে চান, কিন্তু ৪০ লাখ ডলারের প্যাকেজটি মিস করেছেন, তাদের জন্য নতুন আরেকটি সুযোগ রয়েছে। মাঠের একেবারে পাশে দুটি এক্সক্লুসিভ আসন।
প্রতিটির মূল্য হবে “মাত্র” ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন বা ১৫ লাখ ডলার!




