Home LATEST NEWS BANGLA তিনটি ব্যালট বাক্স, দুই জন প্রার্থী ও একটি লাল গোলাপ- যেমন ছিল...

তিনটি ব্যালট বাক্স, দুই জন প্রার্থী ও একটি লাল গোলাপ- যেমন ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের চিত্র

4
0

Source : BBC NEWS

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিজয়ী ঘোঘণার পর একটি লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা ২০ মিনিট। ভোট গণনা শেষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা শুরু করেন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)।

রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী বলে ঘোষণা করেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন, তখনই তুমুল শব্দে টেবিল চাপড়ে সংসদ সদস্যরা অভিনন্দন জানান তাকে।

মির্জা ফখরুলের পাশেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তখনই প্রধানমন্ত্রী নিজের কাছে থাকা একটি লালগোলাপ তুলে দেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের হাতে।

এরপরই বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান তার আসন থেকে উঠে আসেন, মির্জা ফখরুলও উঠে গিয়ে কোলাকুলি করেন জামায়াত আমিরের সঙ্গে।

একে একে সংসদ সদস্যরা ছুটে গিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানান।

ভোট শেষে ফল প্রকাশের চিত্র ছিল এটা।

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ধরে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করা হয়।

জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে বৃহস্পতিবারের এই ভোটে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ভোট দেন ৩৪৩ জন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাওয়া ২৫৫ ভোটের বিপরীতে জামায়াত জোট মনোনীত প্রার্থী অলি আহমদ পান ৮৮টি ভোট।

অসুস্থতা, বিদেশে থাকা ও অন্য কারণে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র মিলে মোট ছয় জন সংসদ সদস্য এই নির্বাচনে ভোট দেননি।

ব্যালটের আউটার ফয়েল বা ব্যালট অংশে পছন্দের প্রার্থীর নামের বিপরীতে নির্দিষ্ট ফাঁকা স্থানে নিজের পূর্ণ নাম লিখে ভোট দিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজ দলের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে নির্দিষ্ট সংখ্যক পাস দিয়ে অল্প সংখ্যক সাংবাদিককে এই ভোট দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সাথে নিয়ে ভোট দেন তারেক রহমান

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

অধিবেশন কক্ষে তিনটি ব্যালট বাক্স

দুপুরে ভোটের আগে সকালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে একটি প্রস্তুতিমূলক সভার আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে। সেই বৈঠক শেষে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সংসদ ভবনে পৌঁছান নির্বাচনি কর্মকর্তারা।

দুপুর দেড়টার মধ্যে প্রস্তুতিমূলক সব কাজ শেষ করে নির্বাচন কমিশন। দুপুর দুইটার আগেই সংসদের অধিবেশন কক্ষে নিজ নিজ আসনে বসেন সংসদ সদস্যরা।

দুপুর দুইটার কয়েক মিনিট আগে অধিবেশন কক্ষে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা।

এরপর সংসদের অধিবেশন কক্ষ আসেন সিইসি ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন।

সংসদ অধিবেশন চলাকালে স্পিকার যে আসনে বসেন তার সামনে পাঁচটি চেয়ার বসানো হয়। মাঝের চেয়ারে বসেন সিইসি মি. উদ্দিন। তার দুই পাশে ছিলেন তিনজন নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন সচিব।

এরপরই কোরআন তেলোয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া।

সিইসি মি. উদ্দিন প্রথমেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কীভাবে ভোট দিতে হবে তার একটি দিক নির্দেশনা মাইকে ঘোষণা করেন। তিনি সে সময় রাষ্ট্রপতি পদে দুইজন প্রার্থী অলি আহমদ ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করেন।

সংসদের অধিবেশন কক্ষের ঠিক মাঝখানে টেবিলের ওপর রাখা হয় তিনটি ব্যালট বাক্স। সরকার ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্সগুলো রাখা হয় সেখানে।

এরপর নির্বাচনি কর্মকর্তারা সংসদ সদস্যদের আসনে আসনে গিয়ে তাদের হাতে ব্যালট পেপারগুলো পৌঁছে দেন। এরপরই ভোট দেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটাররা।

প্রথমে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।

এরপর দুপুর ২ টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়েই ভোট দেন। এরপর বিএনপির সিনিয়র নেতারা একে একে ভোট দেন।

দুপুর দুইটা ২০ মিনিটে ভোট দেন জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা।

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী ঘোঘণার পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সাথে কোলাকুলি করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মির্জা ফখরুল

দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় থাকলেও ভোট শুরুর ঘণ্টা-খানেক অর্থাৎ বিকেল তিনটার আগেই বেশিরভাগ এমপি ভোটদান কার্যক্রম শেষ করেন।

এই ভোট চলাকালে মির্জা ফখরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ করতে এগিয়ে আসেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা। এমপিদের অনেককেই মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ছবি তোলেন। সরকারদলীয় নারী সংসদ সদস্যদের অনেককে তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে সেলফি তুলতেও দেখা যায়।

এই ভোট ঘিরে সংসদের ভেতরে এক ধরনের উৎসবের আবহ তৈরি হয়। রাজনীতির মাঠে দুই পক্ষের কথার লড়াই থাকলেও এই ভোটের দিনে সরকার ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষেই খোশগল্পে মেতে ওঠেন।

ভোট চলাকালে দুইটা ৫৫ মিনিটে প্রথমে জামায়াত আমির ও পরে বিরোধীদলীয় এমপিরা সংসদের অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।

এর কিছুক্ষণ পরে বিকেল সোটা তিনটার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অনেকেই সংসদের অধিবেশন ত্যাগ করেন।

বিকেল সোয়া তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত অনেকটাই ফাঁকা ছিল সংসদের অধিবেশন কক্ষ।

বিকেল চারটা ৪০ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা আবার ফিরে আসেন অধিবেশন কক্ষে। ঠিক পাঁচটায় ভোটগ্রহণ সমাপ্তি ঘোষণা করেন সিইসি।

এসময় সিইসি বলেন, “আপনাদের সহযোগিতায় ভোটগ্রহণ শেষ। এখন ভোট গণনা শুরু হবে। গণনা শেষ হওয়া মাত্রই ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে।”

এরপর নির্বাচনি কর্তার সহায়তাকারীরা তিনটি ব্যালট বাক্স টেবিলে এক টেবিলে নেওয়া হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থীর দুইজন নির্বাচনি এজেন্ট সরকার দলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে ভোট গণনা শুরু হয়।

ভোট গণনার সময় সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর বেশিরভাগ সদস্যের আসনই ছিল ফাঁকা।

জামায়াত আমির ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোলাকুলি করছেন

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

নির্বাচনে ভোট দেননি যে ছয় জন এমপি

এই নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোটার ছিল। তার মধ্যে বিএনপি জোটের ২৪৭ জন, জামায়াত-এনসিপি জোটের ৯০জন, বাকিরা ছিল স্বতন্ত্র ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সময় সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন মোট ৩৪৩ জন। আর ভোট দেননি ছয়জন। ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে বিরোধী দলীয় প্রার্থী অলি আহমেদ পেয়েছেন ৮৮টি ভোট। আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট।

পরে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন সিইসি।

ভোট শেষে সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পর মিডিয়া সেন্টারের ব্রিফ করেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই নির্বাচনে বিরোধীদল অংশগ্রহণ করায় তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান চিফ হুইপ।

তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই নির্বাচনে ছয়জন এমপি ভোট দেননি। এর মধ্যে বিএনপির তিনজন, জামায়াতের একজন, খেলাফত মজলিসের একজন এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন।

তাদের মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস এবং মোস্তফা কামাল পাশা স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে অসুস্থতার কারণে ভোটে অংশ না নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এছাড়া দলটির আরেক সংসদ সদস্য ওসমান ফারুক চিকিৎসার কারণে দেশের বাইরে থাকায় ভোটে অংশ নিতে পারেননি।

এদিকে, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ভোট দেননি।

দেশের বাইরে অবস্থান করায় খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য আবুল হাসান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।

এছাড়া ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটে অংশ নেননি।

ভোট শেষে বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের একটি ব্রিফিংয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা আশা করবো তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জনগণের পক্ষে কাজ করবে”।