Source : BBC NEWS
Khan Mohammad Nasir Uddin
পড়ার সময়: ৪ মিনিট
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পিরোজপুরে এক ব্যক্তির দাফনের জন্য তার মেয়ে ও বোনেরা কবর খুঁড়ছেন এমন ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, যিনি মারা গেছেন তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী ছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে, মি. সাঈদীর অনুসারীরা ওই ব্যক্তির জন্য কবর খুঁড়তে ও দাফনে বাধা দিয়েছে এবং তাদের বাধার কারণেই প্রশাসন থেকে গোপনে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার পর মধ্যরাতে মেয়ে ও বোনদের খোঁড়া কবরে তাকে দাফন করতে হয়েছে।
তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন মিস্টার সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী। তিনি এখন পিরোজপুরে- ১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি।
“ওই ব্যক্তি একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাকে ঘিরে মানুষ ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত ছিল। তবে আমরা সম্মিলিতভাবে জনগণকে শান্ত করেছি। ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তার দাফনে কোনো বাধাও দেওয়া হয়নি,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
যদিও নিহত ব্যক্তির মেয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, তার বাবার জন্য প্রথমে খোঁড়া কবর একদল ব্যক্তি ভরাট করে ফেলার পর তিনি তার ফুফুদের নিয়ে নতুন করে বাড়িতেই কবর খুঁড়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বিবিসি বাংলাকে শুধু বলেছেন, “রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। রাতেই তার দাফন হয়ে গেছে”।
Getty Images
ঘটনা সম্পর্কে কতটা জানা যাচ্ছে
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাদী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ৮৭ বছর বয়সে শনিবার সকালে মারা যান গোপালগঞ্জে তার মেয়ের বাড়িতে।
তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, দুই হাজার চব্বিশ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি পিরোজপুর ছেড়ে গোপালগঞ্জে অবস্থান করছিলেন।
বেশ কিছুদিনের অসুস্থতার পর তিনি মারা গেলে শনিবারই গোপালগঞ্জে জানাজার পর তার মরদেহ দাফনের জন্য পিরোজপুরে আনা হয়। বেলা বারটার দিকে তার পরিবারের সদস্যরা মরদেহ উপজেলা পরিষদে নিয়ে যান।
এই খবরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। তারা সেখানে বিক্ষোভও করে।
ফলে প্রশাসন থেকে তার মরদেহ পুলিশ লাইনসে নিয়ে সেখানেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
পরে রাত দুইটার দিকে মরদেহ বাড়িতে এনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দাফন করা হলেও তাতে পরিবারের সদস্যরা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
এর আগে দিনভর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, প্রথমে খোঁড়া কবরটি মি. সাঈদীর সমর্থকরা মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলে। এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ফলে স্থানীয়রা সেখানে কোনো জানাজার আয়োজন করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় কবর খুঁড়তেও আর কাউকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মানিক পশারীর মেয়ে ও বোনেরা নিজেরাই কবর খুঁড়েছেন।
“বাবার কবর আগে একবার খোঁড়া হয়েছিল। কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি,” স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন মানিক পশারীর মেয়ে সীমু আক্তার।
জানা গেছে, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে রাত দুইটার দিকে প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মরদেহ পুলিশ লাইনস থেকে চিথুলিয়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে মেয়ে ও বোনেদের খোঁড়া কবরে দাফন করা হয়।
Getty Images
মাসুদ সাঈদী যা বলছেন
সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাগারে দণ্ডিত ছিলেন। ২০১০ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকেই কারাগারে ছিলেন মি. সাঈদী।
২০২৩ সালের অগাস্টে তার মৃত্যু হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর হয়ে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে এর আগে থেকেই ধর্মীয় বক্তা হিসেবে তার বেশ পরিচিতি ছিল।
২০১২ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ব্যাপক সহিংসতা হয়েছিল। আপিলের পর সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিল।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে তার সমর্থক বা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী সমর্থকরা মরদেহ দাফনে কোনো বাধা দেননি।
“গতকাল আমরা তার মৃত্যুর খবর পাই। জেলা প্রশাসন মরদেহ নিয়ে এসেছে। তারা লাশ দাফন করবে। একটা মানুষ মারা গেছে। সেজন্য দাফন হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিপত্তি বেধেছে গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে,” বলছিলেন তিনি।
মি. সাঈদীর বলেন, “পিরোজপুরের মানুষ জানে না যে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার দাফনে কোনো মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন না। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রতি এলাকার মানুষের আবেগ আছে। সে কারণে মানুষ উত্তেজিত হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল”।
“আমরা সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছি ও জনগণকে শান্ত করেছি। ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এখন একটা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা পুরোপুরি মিথ্যা,” বলেছেন তিনি।
তবে প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে যে, মানিক পশারী একজন রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর তাদের গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মান জানানোর নিয়ম আছে এবং তাকে গার্ড অব অনারও দেওয়া হয়েছে।




