Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের জন্য প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সরাসরি বা মুখোমুখি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
রুশ প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো একটি খোলা চিঠিতে ইউক্রেনীয় নেতা বলেছেন, ইউরোপের এই যুদ্ধে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ফিরে আসা পর্যন্ত “অপেক্ষা করাটা ভুল হবে”।
তিনি আরও যোগ করেন, কেবল ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে “সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই” শান্তি আসতে পারে।
প্রস্তাবিত আলোচনার সময়সীমা পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিরও আহ্বান জানিয়েছেন জেলেনস্কি। যদিও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আগেই অসম্মতি জানিয়েছিলেন পুতিন।
এদিকে, এই বৈঠকের ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন যে, এই দুই নেতার বৈঠক হলে তা “দারুণ হবে”।
ক্রেমলিন নিশ্চিত করেছে যে তারা চিঠিটি পেয়েছে এবং পুতিনকে এর বিষয়বস্তু জানানো হবে।
অবশ্য জেলেনস্কির পাঠানো ওই চিঠিটি বিদ্রোহী এবং ব্যঙ্গাত্মক সুরেই লেখা হয়েছে, যেখানে সম্প্রতি রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের চালানো হামলাগুলোর দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন যে, “২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বয়স এখন পুতিনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।” এছাড়া চিঠিতে একটি আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে।
জেলেনস্কি লিখেছেন, “ইউক্রেন আমাদের অর্থাৎ আপনার এবং আমার- সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ করার প্রস্তাব দিচ্ছে। আমি একটি বৈঠকের প্রস্তাব করছি।”
যদিও ইউক্রেনীয় নেতার পক্ষ থেকে এটি নতুন কোনো প্রস্তাব নয়, এর আগেও এমনটা হয়েছিল।
যার প্রতিক্রিয়ায় ক্রেমলিন জানিয়েছিল যে, জেলেনস্কি চাইলে মস্কোতে গিয়ে পুতিনের সাথে দেখা করতে পারেন।
তবে এবার লক্ষণীয় বিষয় হলো, কিয়েভ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র “পুরোপুরি ইরানের ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত”।
জেলেনস্কি লিখেছেন, “ইউরোপের যুদ্ধ আবারও মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভুল হবে।”
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
এদিকে, সেন্ট পিটার্সবার্গে বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় পুতিন জানিয়েছেন যে, তিনি “নিশ্চিতভাবেই ইউক্রেনের সাথে চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত ও ইচ্ছুক”, তবে তিনি এ-ও যোগ করেছেন যে, উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।
পুতিন ইঙ্গিত দেন, ট্রাম্প যেহেতু ইরান নিয়ে ব্যস্ত, তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ জেলেনস্কিকে ভূখণ্ড সমর্পণের জন্য রাজি করাতে পারে।
পুতিনের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ইউক্রেনকে অবশ্যই রাশিয়ার আংশিক দখলে থাকা চারটি অঞ্চল- দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া- থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং নেটোতে যোগদানের প্রচেষ্টা ত্যাগ করতে হবে।
ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউক্রেন। তাদের যুক্তি, এটি রাশিয়াকে আবার আক্রমণ করার সাহস জোগাবে, যেমনটা তারা ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের আট বছর পর ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর সময় করেছিল।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধবিরতি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে এবং জেনেভা, আবুধাবি ও ইস্তাম্বুলে পূর্ববর্তী শান্তি আলোচনাগুলোও ব্যর্থ হয়েছে।
১৮০০ শব্দেরও বেশি দীর্ঘ এই চিঠিতে জেলেনস্কি লিখেছেন, “এমন নয় যে ইউক্রেনে আমরা রুশ সৈন্যদের ভাগ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে আপনার যুদ্ধ আমাদের দেশে যা কিছু নিয়ে এসেছে তার পর।
“তবে আমি ইউক্রেনীয়দের নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা আমাদের মানুষদের হারাচ্ছি, এবং প্রতিটি ক্ষতি আমাদের কাছে বেদনাদায়ক,” লিখেছেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
তিনি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথে পা বাড়াতে ভয় পাবেন না। এখন আপনার কাছে প্রধানত এটাই চাওয়া হচ্ছে।”
সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো দেশে এই মুখোমুখি আলোচনা হতে পারে বলেও প্রস্তাব দিয়েছেন জেলেনস্কি।
ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রিয়ে সিবিহা বলেছেন, “যুদ্ধ শেষ করার জন্য এই খোলা চিঠি একটি অর্থবহ প্রস্তাব।”
“আমরা এই প্রস্তাবের একটি অর্থবহ জবাব আশা করছি। এখন এই যুদ্ধ শেষ করার সময়। শান্তির পথ বেছে নেওয়ার সময় এসেছে,” তিনি আরও যোগ করেন।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই চিঠিটি এমন এক দিনে এসেছে যেদিন পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি বড় অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দিচ্ছেন।
আর এর আগের দিনই রাশিয়ার একটি শহরে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল কিয়েভ, যে ঘটনাকে জেলেনস্কি তার বার্তায় “পরিদর্শন” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া, অধিকৃত ক্রিমিয়ার সিমফেরোপোল এলাকায় চারজনের মৃত্যুর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে রুশ-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ। যদিও ইউক্রেন জানিয়েছে যে, তারা একটি জ্বালানি ডিপোতে আঘাত করেছিল।
বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে পুতিন তাৎক্ষণিকভাবে একটি বৈঠক বা চুক্তি হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেছেন, “মি. জেলেনস্কি ইউক্রেনের বৈধ প্রতিনিধি কি না, তা আইনজ্ঞদের এবং আইনি বিশ্লেষণের বিষয়।”
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দুই দেশকে শান্তি আলোচনার জন্য কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি তাদের দেখা করাটা দারুণ হবে। তাদের দেখা করা উচিত। কাজটি সম্পন্ন করুন।”
উভয় পক্ষকে কী ধরনের ছাড় দিতে হবে জানতে চাওয়া হলে মি. ট্রাম্প বলেন, তিনি তা “বলতে চান না”। তিনি যোগ করেন, “আমি চাই তারা প্রত্যেকেই কিছু ছাড় দিক এবং আমার মনে হয় তারা তা করবে।”







