Home LATEST NEWS BANGLA ফের নৃশংস গণধর্ষণের ঘটনা ভারতে, ফিরিয়ে আনছে ২০১২ সালের নির্ভয়ার স্মৃতি

ফের নৃশংস গণধর্ষণের ঘটনা ভারতে, ফিরিয়ে আনছে ২০১২ সালের নির্ভয়ার স্মৃতি

3
0

Source : BBC NEWS

নির্যাতিতা মহিলা শারীরিক অসুস্থতার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad

সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা আপনাকে বিচলিত করতে পারে।

তেরো বছর আগে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাসের ভেতর এক নারীকে নৃশংস ভাবে গণধর্ষণের ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ফের বিহার রাজ্য থেকে এমন আরেকটি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে যেখানে এক নারীর ওপর চালানো নির্যাতনের নৃশংসতা আগের ঘটনার মতোই ভয়াবহ ও নির্মম।

সমাজকর্মীদের মতে, এই ঘটনাটি পুলিশ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উদাসীনতারও একটি উদাহরণ – যে অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে হয় ভারতে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের, বিশেষ করে ছোট গ্রাম বা শহরের বাসিন্দা নারীদের।

ভারতীয় আইন অনুযায়ী, যৌন নির্যাতনের শিকার কোনো নারীর নাম প্রকাশ করা নিষিদ্ধ; তাই আমরা নির্যাতিতাকে ‘সোমা’ (এটি তার আসল নাম নয়) বলে অভিহিত করছি।

চার সন্তানের মা ২৮ বছর বয়সী ওই নারী বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছেন, নিজের বাড়িতেই তাকে একদল পুরুষ আক্রমণ করেন এবং গণধর্ষণের সময় তার যৌনাঙ্গে বিভিন্ন জিনিস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ঘটেছিল ১১ই জুন রাতে বেগুসরাই জেলার একটি গ্রামে। বেগুসরাই ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবথেকে পিছিয়ে পড়া অন্যতম জেলা হিসাবে সরকারিভাবেই স্বীকৃত।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ওই নারীর ওপর বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করে নির্যাতন চালানো হয়। চিকিৎসকরা শরীর থেকে সেগুলো বের করেছেন। এরপরই ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। নির্যাতিতা একটি গুলির খোলও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন, তার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্যাতনের সময় সেটিও তার শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

ভয়াবহ সেই হামলার বিবরণ দিতে গিয়ে সোমা জানান, সেদিন রাতে তিনি যখন তার এক কামরার ঘরের বাইরে টয়লেটে গিয়েছিলেন, তখন জোর করে সেখানে পাঁচজন লোক ঢুকে পড়ে। শৌচাগারটিতে কোনো দরজা নেই; কিছুটা আবরণ দেওয়ার জন্য কেবল একটি পর্দা ঝোলানো থাকে।

তিনি আরও বলেন, “তারা আমার পরনের কাপড় খুলে ফেলে, আমার মুখ আর হাত বেঁধে ফেলে। আমি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা ব্লেড দিয়ে আমার বুকে আঘাত করে এবং আমাকে ধর্ষণ করে।”

সোমা জানান, তার স্বামী প্রথমে তার গোঙানির শব্দকে বিড়ালের ডাক শব্দ বলে মনে করেছিলেন, কিন্তু পরে সন্দেহ হওয়ায় তিনি এগিয়ে আসেন।

“কিন্তু বাড়ির দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। তিনি এক প্রতিবেশীকে ডাকেন; সেই প্রতিবেশী এসে দরজা খুলে দেন এবং আমার অবস্থা দেখে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে দেন।”

নির্যাতিতার বাড়ির বাইরের শৌচাগারে কোনও দরজা ছিল না

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad

বেগুসরাইয়ের পুলিশ সুপার মণীশ (যিনি কেবল একটি নামই ব্যবহার করেন) বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, সোমার “মেডিকেল রিপোর্টে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট।”

তিনি বলেন, “এই মামলায় তিনজনের নাম করে এবং দুজন অজ্ঞাতপরিচয় অভিযুক্ত রয়েছে। আমরা তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছি। এই মামলার জন্য গঠিত একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বাকিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে অভিযান চালাচ্ছে। তদন্ত চলছে।”

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অপরাধের পূর্ব-ইতিহাস রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণ সংক্রান্ত ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তবে সোমা জানিয়েছেন, ভয়াবহ নির্যাতনের সেই রাতে পুলিশ বা চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খুব একটা সহায়তা পাননি।

ই-রিকশা চালক ওই ব্যক্তি তার অচেতন স্ত্রীকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটি থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি জানিয়েছেন, পুলিশ প্রথমে তার অভিযোগ নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করে এবং স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।

বেগুসরাই পুলিশ জানিয়েছে, “অবহেলা, উদাসীনতা ও সংবেদহীনতার” দায়ে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজীব কুমারকে ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। পুলিশ আরও জানায় যে, এই ঘটনায় গত ১৩ই জুন স্থানীয় থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।

সোমা ও তার স্বামী জানিয়েছেন যে, সঠিক চিকিৎসা সেবা পেতেও তাদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

হামলার রাতে কাছের একটি বেসরকারি ক্লিনিক তাদের ফিরিয়ে দেয় বলে জানা গেছে; ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে তারা জরুরি বিভাগের কোনোও রোগী দেখে না। তখন কোনোও ডাক্তার দায়িত্বে ছিলেন না বলেও জানিয়েছিলেন ওই ক্লিনিকটি।

এরপর তাকে একটি সরকারি কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে জেলা হাসপাতালে রেফার করে তারা।

ঘটনার সময় নির্যাতিতা তার ঘরের বাইরে শৌচাগারে গিয়েছিলেন

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad

সোমা বিবিসিকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে তাকে যে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, তা মোটেও সন্তোষজনক ছিল না।

১২ই জুন জ্ঞান ফেরার পর তিনি ও তার স্বামী চিকিৎসকের কাছে গণধর্ষণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ইনজেকশন দেওয়ার সময়ে চিকিৎসক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনাকে কি ধর্ষণও করা হয়েছিল?’ আমি বারবার তাকে বলছিলাম, ‘হ্যাঁ, আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।”

তবে বেগুসরাইয়ের সিভিল সার্নেজ অশোক কুমার বিবিসিকে জানান, ওই নারীকে পেটে ব্যথার অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। গণধর্ষণের বিষয়টি তাদের জানানো হয় ১৩ই জুন। “এটা জানার পরেই চিকিৎসকরা দ্রুত তার ডাক্তরি পরীক্ষা করেন।”

এরপর হাসপাতাল থেকে সোমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু পরদিন জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় তাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তার স্বামী বিবিসিকে জানান।

একদিন হাসপাতালে রেখে তাকে আবারও ছেড়ে দেওয়া হয়।

সোমার স্বামী বলছিলেন, “বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়া ও তীব্র পেট ব্যথার কথা জানানোর পর গ্রামেরই এক ধাত্রী তাকে পরীক্ষা করেন। তিনি সতর্ক করেন যে নির্যাতিতার শরীরের ভেতরে কোনো বস্তু রয়ে গেছে। ১৮ই জুন সকালে সোমা আমাদের একটি কার্তুজের খোল দেখান, যা তার যৌনাঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসেছিল।”

এরপর তাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

সিভিল সার্জেন ডা. কুমার বলেন, “এটি ছিল একটি খালি কার্তুজ বা গুলির খোল। আমরা তাকে পুনরায় পরীক্ষা করি এবং চিকিৎসকরা তার শরীর থেকে আরও বেশ কিছু বস্তু বের করে আনেন। বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন।”

সোমার এই ঘটনায় ভারতে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

২০১২ সালে দিল্লিতে ২৩ বছর বয়সী এক ছাত্রী, যাকে ‘নির্ভয়া’ নামে পরিচয় দেওয়া হয়, তার ওপর চালানো নৃশংস গণধর্ষণ ও পরবর্তীতে মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে এর তুলনা টানা হচ্ছে। ওই তরুণীর ওপরেও আরও অনেক বস্তু ব্যবহার করে নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

২০১২ ঘটনার সময় সারা ভারত জুড়ে বিক্ষোভ প্রর্দশন হয়

ছবির উৎস, Vipin Kumar/Hindustan Times via Getty Images

ওই ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

কঠোরতর ধর্ষণ-বিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়, যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও ছিল। ‘নির্ভয়া’কে গণধর্ষণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত চারজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০২০ সালে। দোষীদের মধ্যে একজন কারাগারে মারা যান এবং একজন কিশোর শিশু-কিশোর অপরাধীদের ‘হোমে’ সাজা ভোগের পরে মুক্তি পেয়েছে।

এরপর থেকে যৌন অপরাধের বিষয়ে কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও, ভারতে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।

ধর্ষণ-বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ইয়োগিতা ভায়ানা বলেন, “আমরা কোনো শিক্ষাই নিইনি।”

তিনি আরও বলেন যে, অধিকাংশ ঘটনাই আর নথিবদ্ধ হয় না বা কারোর নজরে আসে না, কারণ চরম বর্বরতার ঘটনাতেও সমাজ এখন অনেকটাই অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে।

“এমন ঘটনা ক্রমাগত ঘটেই চলেছে কারণ ভারতের প্রতিটি কোণায় এখনও এই বার্তা পৌঁছায়নি যে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তাই সমাজে এ নিয়ে কোনো ভীতি বা আতঙ্ক তৈরি হয়নি,” তিনি বিবিসিকে বলেন।

মিজ. ভায়ানা বলেন, “সোমার ঘটনাটি গণমাধ্যমের যে মনোযোগ পেয়েছে, তার একমাত্র কারণ তার যৌনাঙ্গে একটি গুলি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে সে যে প্রাণে বেঁচে আছে সেই বিষয়টা একমাত্র ইতিবাচক দিক।”

বেগুসরাইয়ের সোমা এখনো হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন।

সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মীদের আনাগোনায় তাকে প্রায়ই বিরক্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি এখনো তীব্র ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন।

তবে তিনি আশাবাদী যে দ্রুত সুস্থ হয়ে সন্তানদের কাছে বাড়ি ফিরবেন।

“আমি আমার সন্তানদের নিয়ে খুব চিন্তিত, ওরা খুবই ছোট। এখান থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়রা ওদের দেখাশোনা করছেন। আমি দ্রুত ওদের কাছে বাড়ি ফিরতে চাই।”