Home LATEST NEWS BANGLA আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে চাপের মুখে পুলিশ

আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে চাপের মুখে পুলিশ

4
0

Source : BBC NEWS

পুলিশ

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি উদ্বেগ জানানোর পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। সংগঠনটির নেতাকর্মীরা দেশের কোথাও যেন তৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য টহল ও নজরদারি বাড়ানোসহ নতুন করে মাঠপর্যায়ে বেশকিছু নির্দেশনা জারি করেছে বাহিনীটি।

এরপরও যদি কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়, সেটার দায়ভার ওই এলাকার দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাদেরকেই নিতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

“সেরকম ঘটনা যদি ঘটে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন পুলিশের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা।

সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদকে ইতোমধ্যেই প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

যদিও ডিএমপি’র আদেশে তাদের প্রত্যাহারের পেছনে ‘প্রশাসনিক কারণে’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে গত এগারোই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার দুপুরে ঢাকার গুলশান এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের পর থেকেই সেখানকার দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছিলো।

এমনকি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

“তারা (আওয়ামী লীগ) মানুষ জড়ো করলো এতগুলো, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানে না? পুলিশ প্রশাসন, তারা কী করছে?,” ঘটনার পর বলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

মূলত এর পরেই পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা বন্ধে মাঠপর্যায়ে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়।

এদিকে, বৃহস্পতিবার ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকেও প্রত্যাহার করেছে ডিএমপি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নামে একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images

কী আছে অডিও রেকর্ডে?

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মি. হাসানকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদরদপ্তরে সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করেন।

কী কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?-এমন প্রশ্নের জবাবে মি. হোসেন “প্রশাসনিক কারণে”র কথা বলেছেন।

তবে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রত্যাহার আদেশের আগে ক্যান্টনমেন্ট থাকার ওই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে।

সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করে একজনকে বলতে শোনা যায় যে, তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসলে পুলিশ “কিছুই করতে পারবে না”।

“রাস্তায় থাকা পুলিশ খুবই দুর্বল,”- এমন মন্তব্যও করতে শোনা যায় ওই অডিওতে। সেইসঙ্গে, পুলিশে ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরকারের দিকে ঝুঁকছেন’ এবং পদায়নের ক্ষেত্রে ‘ঘুষ বাণিজ্য করছেন’ বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা বলা হয়েছে যে, অডিওটি পুলিশ কর্মকর্তার মো. রাকিবুল হাসানের। যদিও সেটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা বিবিসি’র পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এছাড়া মি. হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ

ছবির উৎস, Getty Images

শুক্রবার কী ঘটেছিল?

গত শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ঢাকার গুলশান-১ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে একটি ঝটিকা মিছিল বের করে।

সেটি বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং ধাওয়া দিয়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। তখন মিছিলকারীদের দিক থেকে অন্তত দু’টি ককটেল নিক্ষেপ করা হয় বলে জানায় পুলিশ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পরে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকটি তাজা ককটেলসহ মিছিলে অংশ নেওয়া দু’জনকে আটক করা হয়।

পরে গুলশান থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। তারা ছাড়াও ওই মামলায় আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিছিলকারীদের ভিডিও দেখে পরবর্তীতে আরও ৮১ জনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানান কর্মকর্তারা।

আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দলীয় প্রতীক

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

গুলশানের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি ও নজরদারি রয়েছে, সেখানে কীভাবে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী একত্রিত হলো এবং মিছিল বের করলো, ঘটনা জানাজানির পর থেকে সেই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

“নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল হঠাৎ করে উঁকি মারার চেষ্টা করছে। কিন্তু করছে কীভাবে? এখানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করছে?…পুলিশ প্রশাসন, তারা কী করছেন?,” ঘটনার পরদিন ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেন. মি. রিজভী।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। দায়িত্ব পালনে কারো গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান কর্মকর্তারা।

ঘটনার তিনদিন পর গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে সরকারের কাছে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল।

“তবে আমাদের পুলিশ বাহিনী শুক্রবারে হয়তো আন্দাজ করতে সক্ষম হয়নি যে, ওই এলাকায় জুমার নামাজ পড়তে এসে তারা এরকম একটা কিছু করতে পারে,” বলেন মি. আহমদ।

ওই ঘটনায় পুলিশের যে ভূমিকা ছিল, সেটাকে ‘ব্যর্থতা বলার কোনো সুযোগ নাই’ বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

“আমরা পরবর্তীতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি,” বলেন মি. আহমদ।

সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

জরুরি বৈঠক

কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পরেও গত এক বছরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ছোট ছোট ঝটিকা মিছিল বের করতে দেখা গেছে।

কিন্তু ওই মিছিলের তুলনায় গুলশানের মিছিলটি ছিল বেশ বড়।

এমন একটি সময়ে মিছিলটি বের হলো, যার কিছুদিন আগে সংগঠনটির সভাপতি শেখ হসিনা, যার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হয়েছে এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই যিনি ভারতে অবস্থান করছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন বলে বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

তার এমন বক্তব্যের পর গত শুক্রবার দিনে-দুপুরে সংগঠনটির শতাধিক নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে যেভাবে মিছিল বের করেছে, এতে বেশ চাপে পড়ে যায় পুলিশ। পরে বিষয়টি নিয়ে বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন।

আওয়ামী লীগসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো যেন কোথাও তৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তারা।

গত ১৪ই সেপ্টেম্বরের ওই বৈঠকের পর সারা দেশের থানাগুলোকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ঢাকাসহ বেশকিছু এলাকায় থানার ওসি বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, তারা সতর্ক থাকা এবং টহল জোরদার করার বিষয়ে নির্দেশনা পেয়েছেন।

“কিন্তু এটা যেহেতু আমাদের ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ একটা নির্দেশনা, সেজন্য এটা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা আমার ঠিক হবে না,” বলছিলেন ডিএমপি’র একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা বন্ধ করতে না পারলে সেটার দায়ভার ওই এলাকার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিভাগীয় শাস্তির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

“ইতোমধ্যেই অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে এবং এক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওই কর্মকর্তা।