Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Swatantra Bhardwaj/X
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ চলাকালীন ককরোচ জনতা পার্টির এক সদস্যের বাবার উপর হামলা চালানো ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল প্রভাবশালী নেতার হস্তক্ষেপে – এই অভিযোগকে ঘিরে বিতর্ক বেঁধেছে।
সম্প্রতি সিজেপির যে বিক্ষোভকে ঘিরে দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল, তারই সঙ্গে সম্পর্কিত একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যাকে ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত।
ওই ভিডিওতে স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায় তিনি সিজেপির বিক্ষোভে সামিল নিশু আজাদের বাবার মাথায় আঘাত করলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পুলিশি পদক্ষেপের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছেন।
তার হাতে যে কড়া (ধাতব বালা) রয়েছে সেটা দিয়েই নাকি আঘাত করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি।
মি. ভরদ্বাজ নিজেকে হিন্দুত্ববাদী বলে দাবি করে থাকেন।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা ওই ভিডিওতে তিনি আরো দাবি করেন, ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ আনা হলেও দিল্লি সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী কপিল মিশ্রের ফোন পাওয়ার পর তাকে নাকি ছেড়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সেই সময়ে বিক্ষোভকারীদের মারধর করা ব্যক্তিদের বাঁচানোর অভিযোগ ওঠে। যদিও দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী এই মামলায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় কপিল মিশ্রের তরফে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া না মিললেও দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে মারধরের ওই ঘটনায় কেউ হস্তক্ষেপ করেননি।
ছবির উৎস, PTI
কী থেকে বিতর্কের সূত্রপাত?
সামাজিক মাধ্যমে স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ সম্প্রতি একটা ভিডিও শেয়ার করেছেন যা ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি একজন ইনফ্লুয়েন্সার যিনি নিজেকে হিন্দুত্ববাদী বলে পরিচয় দেন।
ওই ভিডিওতে তিনি বলেছেন, “আমরা নিশুর বাবার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি। আপনারা জানেন যে এ ক্ষেত্রে (আইনের) কোন ধারা প্রযোজ্য- ৩০৭ নম্বর ধারা। ওর (যার মাথায় আঘাত লেগেছিল) মাথায় সাতটা সেলাই পড়েছিল, তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যেতে হয়েছিল।”
“আমাকে জেলেও যেতে হয়নি। সারা বিশ্বের জানা উচিত যে আমাকে জেলে যেতেই হয়নি। আমি তো গোটা রাত ঘুরে বেরিয়েছি।”
এই ভিডিওতে তিনি বিজেপির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে তার পরিচয় আছে বলেও দাবি করেছেন।
তবে বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ অবশ্য দাবি করেছেন যে, তিনি আত্মরক্ষার্থে হামলা করেছিলেন এবং সেই সময়ে আত্মরক্ষা না করলে গণপিটুনির শিকার হতেন।
এরপরই নিশু আজাদ এক্স হ্যান্ডেলে একটা ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে তাকে বলতে শোনা গিয়েছে, “স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের একটা ভিডিও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে তিনি নিজেই স্বীকার করছেন যে তিনি আমার বাবার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ আনা উচিত ছিল, ৩০৭ ধারায় মামলা করা উচিত ছিল।”
“যখন সে তার বাবার মাথা ফাটিয়ে দেন তখন আমরা তার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ কিছুই করছে না। তারা মেডিকেলের নামে ঘোরাচ্ছে। আমি দিল্লি পুলিশের কাছ থেকে ন্যায়-বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছি।”
“রাহুল গান্ধীজি, আপনার কাছে আমার প্রত্যাশা আছে। আমি আশা করি আপনি আমাকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবেন। যাদের মনে আইনের ভয় নেই, কীভাবে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারে তারা? এদের জেলে থাকা উচিত।”
এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্স হ্যান্ডেলে এই প্রসঙ্গে একটা পোস্ট করেন।
তিনি লেখেন, “আমাদের যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে বিজেপি-সমর্থিত গুন্ডা স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের হাতে সঞ্জয় নামের এক দলিত সম্প্রদায়ের ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার পর কী ঘটেছিল তা আমি আপনাদের বলছি – সঞ্জয়ের মাথা ফেটে গিয়েছিল। ক্ষত এতটাই গুরুতর ছিল যে এফআইআর-এ স্পষ্টভাবে খুনের চেষ্টার উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। পুলিশ এই ধারা যোগ করতে রাজি হয়নি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, গুরুতর আঘাতের মামলায় যে ধারা ব্যবহার করার কথা, তাও দেওয়া হয়নি। সৌরভ দাসের দাবি, ডিসিপি শচীন শর্মা এবং এসিপি অজয় শর্মা তাদের অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “যান, আদালতের আদেশ নিয়ে আসুন।”
পাশাপাশি আহত ব্যক্তির মেডিকেল রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের সঙ্গে ওইদিন আরো অনেকে ছিলেন বলে দাবি করে সৌরভ দাস অভিযোগ করেছেন সেই সহযোগীদের এখনো শনাক্ত করা হয়নি।
ছবির উৎস, PTI
শুক্রবার বিক্ষোভ সিজেপি-র
নিশু আজাদ এবং তার বাবার জন্য ন্যায়বিচার চাইতে শুক্রবার দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় এসে উপস্থিত হন সিজেপির সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা। সিজেপির সমর্থকদের অনেকেই সঙ্গে ছিলেন।
সেখানে আশুতোষ রাঙ্কা সাংবাদিকদের বলেন, “যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ চলার সময় নিশুর বাবা সঞ্জয়কে মারধর করা হয়েছিল। আমরা ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি। দিল্লির পরিস্থিতি এখন এমন যে, অপরাধী প্রকাশ্যে নিজের অপরাধ স্বীকার করছে। কিন্তু বিজেপির ইশারায় দিল্লি পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা নিশু এবং তার বাবার পাশে দাঁড়িয়েছি। আমরা পুলিশের কাছে হত্যা মামলা দায়ের করার দাবি জানাচ্ছি।”
সিজেপির সমর্থকরা থানার বাইরে বিক্ষোভও দেখান।
পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিশু আজাদ বলেন, “পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে স্বতন্ত্রকে গ্রেফতার করা হবে। তারা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আমরা আশা করি এতে আর দেরি হবে না। বেশ কয়েকদিন ধরে তার সমর্থকরা আমাকে গালিগালাজ করছে, ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে।”
“আমি তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর-ও দায়ের করেছি। এই ঘটনা আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। আমি কয়েক সপ্তাহ স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং মনে হচ্ছিল সবাই আমাকে বিচার করছে। আমি আশা করি পুলিশ এখন ব্যবস্থা নেবে এবং নিশ্চিত করবে যে আমাকে আর কোনো কষ্ট ভোগ করতে না হয়।”
ছবির উৎস, ANI
পুলিশ কী বলছে?
সৌরভ দাসের পোস্টের জবাবে, ডিসিপি নিউ দিল্লির হ্যান্ডেল থেকে এক্স-এ একটা পোস্টে বলা হয়েছে, “২৩শে জুন, যন্তর মন্তরে সিজেপি-র প্রতিবাদ চলাকালীন গাজিয়াবাদের বাসিন্দা শ্রী সঞ্জয় কুমার (৩৮) একটা কথিত ধস্তাধস্তির সময়ে এক ব্যক্তির পরা ব্রেসলেট (কড়া) দ্বারা মাথায় আঘাত পান। আরএমএল হাসপাতালের ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা করে আঘাতকে সাধারণ প্রকৃতির বলে বর্ণনা করেছেন। ওই আঘাত কোনো অস্ত্রের দ্বারা হয়নি, বরং ব্রেসলেটের দ্বারা হয়েছে। মাথার খুলি ভাঙার অভিযোগ কোনো তথ্য বা মেডিকেল-লিগাল কেস সমর্থিত নয় এবং তা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন।”
তিনি লিখেছেন, “তার (সঞ্জয়ের) জবানবন্দির ভিত্তিতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার প্রাসঙ্গিক ধারায় একটা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ব্যক্তিদের আটক করা হয়েছে এবং তদন্তের সময় সুরজ কুমার (২৪) ও স্বতন্ত্র ভরদ্বাজকে (২১) আইন অনুযায়ী নোটিশ জারি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং শিগগিরই উপযুক্ত আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হবে।”
দিল্লি পুলিশের তরফে এই ঘটনায় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করা হয়েছে।
এক্স হ্যান্ডেলে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, “এই মামলায় কোনো অযাচিত প্রভাব বা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তথ্যগতভাবে ঠিক নয় এবং ভিত্তিহীন। বিষয়টা কঠোরভাবে আইন ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী সমাধান করা হয়েছে।”
সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লি পুলিশের পোস্টে মন্তব্য করে বলেছেন, “অপরাধী বলছে ‘আমি অপরাধ করেছি’, দিল্লি পুলিশ বলছে ‘না, আপনি অপরাধ করেননি’।”
ছবির উৎস, Getty Images
রাজনৈতিক বাগবিতন্ডা
নিশু আজাদ ন্যায়বিচার পেতে সাহায্যের জন্য রাহুল গান্ধীর কাছে আবেদন জানিয়ে একটা ভিডিও পোস্ট করেছেন। এর পর রাহুল গান্ধীও এক্স- এ পোস্ট করেন ।
রাহুল গান্ধী লিখেছেন, “নিশু, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি তোমার সঙ্গে আছি। এটা স্পষ্ট যে তোমাকে নিশানা করা হয়েছে কারণ তুমি তোমার সম্প্রদায় এবং শিক্ষার্থীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলো। একদিকে অমিত শাহের দিল্লি পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর অমানবিক বর্বরতা চালায়। অন্যদিকে, যে অপরাধী এক দলিত মেয়ের বাবার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, সে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
“নরেন্দ্র মোদী জি এবং অমিত শাহ জি- আপনারা এবং আপনাদের দলের সদস্যরা কেন এমন একজন অপরাধীকে রক্ষা করছেন? এখন কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কি আপনারা অন্য কাউকে রক্ষা করে যাবেন? নিশু, তোমার লড়াই একা নয়। ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।”
দিল্লি পুলিশের টুইটের জবাবে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সকেত গোখলে লিখেছেন, “দিল্লি পুলিশ, তোমাদের কি কোনো লজ্জা নেই? অভিযুক্ত নিজেই ভিডিওতে খোলাখুলিভাবে বলছেন যে একজন বিজেপি মন্ত্রী তাকে বাঁচিয়েছেন এবং পুলিশ তাকে সহজেই ছেড়ে দিয়েছে। এটা অত্যন্ত হতবাক করার মতো। একজন ব্যক্তি খোলাখুলিভাবে বলছেন যে তিনি এটা করেছেন, আর দিল্লি পুলিশ বলছে যে তারা এটা করেনি।”
আম আদমি পার্টি তাদের এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছে,”প্রধানমন্ত্রী আমাদের বড় ভাই। এই কথাগুলো বলছে একজন রাস্তার গুন্ডা, যে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রতিদিন গুন্ডামি করছে। প্রধানমন্ত্রী এই ধরনের গুন্ডাদের সুরক্ষা দিচ্ছেন।”
সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব এক্সে লিখেছেন, “বিজেপি কি সরকার, নাকি অপরাধীদের উকিল?”




