Home LATEST NEWS BANGLA ক্রিকেট থেকে বলিউড, রিনা রায়ের সাথে প্রেম- পাকিস্তানি ক্রিকেটার মহসিন খানের গল্প

ক্রিকেট থেকে বলিউড, রিনা রায়ের সাথে প্রেম- পাকিস্তানি ক্রিকেটার মহসিন খানের গল্প

5
0

Source : BBC NEWS

রীনা রায় ও মহসিন খান

ছবির উৎস, IMDB & Getty Images

সময়টা ছিল ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ব্যাঙ্গালোরে টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ তখনও শুরু হয়নি। এরই মধ্যে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক খ্যাতনামা পরিচালক এক বিখ্যাত পাকিস্তানি ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা হলে তিনি তাকে নিজের ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, “আমার কাছে আপনার জন্য একটি চরিত্র আছে।”

এর জবাবে ওই ক্রিকেটার বলেন, “আপনি জানেন, এই মুহূর্তে আমি ক্রিকেট নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। যত দিন সম্ভব, আমি আমার দেশের হয়ে খেলতে চাই। তবে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পরে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি এই (চরিত্রে) অভিনয় করব।”

এই দুটি কথাতেই এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু কিছুদিন পরে মুম্বইয়ে সেই দুজনের আবার দেখা হয়।

সেই সময় ওই পরিচালক ক্রিকেটারকে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, “ছবির বিষয়বস্তু খুব ভালো। আমি ইতিমধ্যেই ধর্মেন্দ্র ও বিনোদ খান্নাকে কাস্ট করেছি। এই ছবিতে আপনাকে তৃতীয় নায়ক হিসেবে নিতে চাই।”

আর এই কথোপকথনের পরই ওই ক্রিকেটারের বলিউডের ঝলমলে জগতে প্রবেশ ঘটে। সেই পাকিস্তানি ক্রিকেটার ছিলেন মহসিন খান, আর পরিচালক ছিলেন জে পি দত্তা।

জে পি দত্তা এবং মহসিন খানের প্রসঙ্গ আরেকটি নাম ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই নামটি হল, রিনা রায়।

অভিনেত্রী রিনা রায় এবং জে পি দত্তার মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। আসলে, মহসিন খানের চলচ্চিত্র জীবন শুরু করা এবং সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রিনা রায়ই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

মহসিন খান ও রিনা রায়ের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল লন্ডনে। সেই সময় মহসিন খান ইংল্যান্ডে লিগ ক্রিকেট খেলছিলেন এবং রিনা রায় মহসিন খানের বোনের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন।

মহসিন খানের সঙ্গে রিনা রায়ের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তার বোনই। তিনি জানিয়েছিলেন, রিনা রায় ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়িকাদের অন্যতম।

রীনা রায় ও মহসিন খান

ছবির উৎস, Getty Images

রীনা রায়ের সঙ্গে প্রেম ও বিচ্ছেদ

তবে মহসিন খানের চলচ্চিত্রে বিশেষ কোনও আগ্রহ ছিল না। বিশ্ব তাকে একজন স্টাইলিশ ক্রিকেটার হিসেবেই চিনত।

বিবিসি নিউজ হিন্দির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মহসিন খান বলেন, “রিনা রায়কে বিয়ে করার আগে আমি তার কোনও ছবিই দেখিনি। চলচ্চিত্রের প্রতি আমার আগ্রহ এতটাই ছিল যে, বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যদি টেলিভিশনের পর্দায় অমিতাভ বচ্চনের কোনও দৃশ্য চলতে দেখতাম, তাহলে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে সেটা দেখতাম। তা ছাড়া আমি প্রায় কোনও সিনেমাই দেখতাম না।”

মহসিন খান ও রিনা রায়ের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে প্রেমে পরিণত হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

তবে এর আগেই ভারতে ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলি খান পতৌদি ও অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের বিয়ে হয়েছিল। পরবর্তীকালে আরও বহু ক্রিকেটারই অভিনেত্রীদের বিয়ে করেছেন। কিন্তু কোনও পাকিস্তানি ক্রিকেটারের কোনও ভারতীয় অভিনেত্রীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার ঘটনা তখন ছিল একেবারেই নজিরবিহীন।

সে সময় দু’জনেই নিজেদের কেরিয়ারের শীর্ষে ছিলেন। রিনা রায়ের জীবনের পথচলা শুরু হয়েছিল সায়রা আলি নামে, পরে তিনি রূপা রায় হন এবং শেষ পর্যন্ত রিনা রায় নামে পরিচিতি পান। চলচ্চিত্র নির্মাতা বি আর ইশারা তাকে এই নাম দিয়েছিলেন।

চলচ্চিত্র জীবনের নানা উত্থান-পতন এবং কিছু ব্যর্থতার পর তার নামের সঙ্গে ‘নাগিন’, ‘আশা’ এবং ‘কালিচরণ’-এর মতো সফল ছবির নাম জুড়ে গিয়েছিল।

বিয়ের পর রিনা রায় চলচ্চিত্র জগৎ থেকে সরে এসে পাকিস্তানে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পরে এমন সময় আসে, যখন মহসিন খান ও রিনা রায় আলাদা পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে তাদের বিচ্ছেদের খবর সংবাদমাধ্যমে ঠিক ততটাই বড় শিরোনাম হয়েছিল, যতটা তাদের বিয়ের খবরটি হয়েছিল। বিয়েটাও হয়েছিল অবশ্য বেশ ধুমধাম করে।

বিচ্ছেদের পর রিনা রায় ভারতে ফিরে আসেন। তিনি আবার চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। পরে তাঁকে টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবেও দেখা যায়।

তাদের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে, যার নাম প্রথমে ছিল জান্নাত। পরে তার নাম রাখা হয় সনম খান।

মেয়ে সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়েও তাদের মধ্যে আইনি লড়াই হয়েছিল। প্রথমে মেয়েটি তার বাবার কাছেই ছিল, কিন্তু পরে সে তার মায়ের কাছে চলে যায়।

এক সাক্ষাৎকারে মহসিন খান বলেছিলেন, “আমি একজন মানুষকে তার সৌন্দর্য বা খ্যাতির জন্য নয়, বরং তার স্বভাব এবং ভালো ব্যবহারের জন্য বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের আগে আমি রিনা রায়ের কোনও ছবিই দেখিনি। আমার এই কথা হয়তো কেউ বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু এটাই সত্যি।”

লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে ১৯৭৮ সালে একটি ক্লাব ম্যাচে ব্যাট হাতে মোহসিন খান

ছবির উৎস, Mike Stephens/Central Press/Hulton Archive/Getty Images

মহসিন খানের চলচ্চিত্রে কেরিয়ার

মহসিন খানের ‘বাঁটওয়ারা’ ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা বেশ আকর্ষণীয় ছিল। এই ছবির অভিনয় শিল্পীদের তালিকায় ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না এবং শাম্মি কাপুরের মতো বড় বড় নাম ছিলেন।

তাদের সামনে অভিনয় করা সহজ কাজ ছিল না। বিশেষত এমন একজনের জন্য, যার আগে অভিনয়ের কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। তবে জে পি দত্তার নির্দেশনা ও পরামর্শ মহসিন খানের জন্য এক পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করার কাজটি অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল।

জে পি দত্তা ক্রিকেটের ভাষায় মহসিন খানকে একটি দৃশ্য বুঝিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ধরুন আপনি শতরান করেছেন, কিন্তু তারপরও আপনার দল হেরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি কীভাবে আনন্দের চেয়ে বেদনার অনুভূতিটা বেশি উপলব্ধি করবেন।”

মহসিন খানের জন্য আনন্দের মুহূর্ত ছিল তখন, যখন ‘বাঁটওয়ারা’ ছবিতে তার অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে মনোনীত হন।

এই বিভাগে তার সঙ্গে নানা পাটেকর, বিনোদ খান্না, অমরীশ পুরী এবং পঙ্কজ কাপুরও মনোনীত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘পারিন্দা’ ছবির জন্য নানা পাটেকর এই পুরস্কার জিতেছিলেন।

ব্যক্তিগতভাবে মহসিন খানের পছন্দের ছবি ‘সাথী’। এই ছবির পরিচালক ছিলেন মহেশ ভাট।

বিবিসি নিউজ হিন্দিকে মহসিন খান বলেন, “ভাট সাহেব অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ। তার সঙ্গে বসে জীবনের দর্শন খুব ভালোভাবে বোঝা যায়।”

‘সাথী’ ছবির অনেক বিষয়ই মহসিন খানের ভালো লেগেছিল। পাশাপাশি কুমার শানুর গাওয়া গান, ‘জিন্দেগি কি তালাশ মে হাম, মওত কে কিতনে পাস আ গয়ে’ তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল।

মহসিন খান বলিউডের ১৩টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মহানতা’ ছিল তার শেষ বলিউড ছবি।

মহসিন খান বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। তার প্রথম ছবি ছিল ‘রাজ়’। এই ছবিতে তার সহশিল্পী ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী বাবরা শরিফ। বাবরা শরিফের সঙ্গে তিনি ‘পিয়াসা সাওয়ান’ ছবিতেও নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

তার অন্যান্য পাকিস্তানি ছবির মধ্যে রয়েছে ‘হাথি মেরে সাথী’, ‘জান্নাত’, ‘ইনসানিয়ত’, ‘বেটা’, ‘সব কে বাপ’, ‘চোরো কে বাপ’, ‘ঘুঙঘট’, ‘দিল তেরা আশিক’ এবং ‘চলতি কা নাম গাড়ি’।

পাকিস্তানে তার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘সালা বিগড়া যায়ে’, যা ১৯৯৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল।

মহসিন খানের অধিকাংশ ছবিই বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়েছিল।

পাকিস্তান ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে মহসিন খান (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Arif Ali/AFP via Getty Images

ক্রিকেটের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার উপদেশ

মহসিন খানের জন্ম হয়েছিল একটি শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার বাবা পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন, আর মা ছিলেন শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপাল।

একদিকে তিনি শৃঙ্খলার শিক্ষা পেয়েছিলেন, অন্যদিকে পড়াশোনার প্রতিও পূর্ণ মনোযোগ ছিল। এই দুই গুণই মহসিন খানের ব্যক্তিত্বকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছিল।

তার বাবা গড় বিশ্ববিদ্যালয়ের হকি দলের প্রতিনিধিত্বও করেছিলেন। তিনি নিজেও একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন, তাই মহসিন খানকেও খেলাধুলার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেছিলেন।

এর ফলেই ছাত্রজীবনে মহসিন খান প্রায় সব ধরনের খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি তিনি পাকিস্তানের ন্যাশনাল জুনিয়র ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন।

তবে কলেজে তার পড়াশোনার বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও গণিত। তাই পড়াশোনার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। ক্রিকেট তিনি নামমাত্রই খেলতেন।

একটি ম্যাচে খেলোয়াড়ের অভাব হওয়ায় পদার্থবিদ্যার শিক্ষক মুকাররম শেরওয়ানি, যিনি ক্রীড়া শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করতেন, তাকে কলেজ দলের হয়ে একটি ম্যাচ খেলতে বলেন। সেই ম্যাচেই তিনি শতরান করে ফেলেন।

সেই ম্যাচের একজন আম্পায়ার ছিলেন উমর খান। তিনি সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার এবং টেস্ট আম্পায়ারও ছিলেন।

মহসিন খানের ব্যাটিং দেখে তিনি পরামর্শ দেন, ক্রিকেটকে গুরুত্ব সহকারে খেলতে। এরপরই প্রকৃত অর্থে ক্রিকেটের সঙ্গে মহসিন খানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

অনূর্ধ্ব-১৯ স্তরে খেলতে গিয়ে তিনি একটি ত্রিশতকও করেছিলেন। এরপর তিনি করাচি এবং পাকিস্তান ইউনিভার্সিটিজ দলের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন।

২০০৭ সালে ঢাকায় আফ্রো-এশিয়া কাপের দল ঘোষণাকে ঘিরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পাকিস্তানি নির্বাচক মহসিন খান। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, DESHAKALYAN CHOWDHURY/AFP via Getty Images

লর্ডসে ঐতিহাসিক দ্বিশতরান

মহসিন খান তার টেস্ট কেরিয়ার শুরু করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তানের তারকা ক্রিকেটার কেরি প্যাকার ক্রিকেটে যোগ দিয়েছিলেন।

সেই সময়ে তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত পাকিস্তান দলের অধিনায়কত্ব সামলাতে হয়েছিল ওয়াসিম ওয়ারিকে। পরে যখন তারকা ক্রিকেটাররা দলে ফিরে আসেন, তখন তাদের ভিড়ে নিজের জায়গা পাকা করতে মোহসিন খানকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

এই সময় যারা জাভেদ মিয়াদাদের অধিনায়কত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, মহসিন খান তাদের মধ্যেও ছিলেন।

১৯৮২ সালে লাহোর টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে করা শতরানই মহসিন খানকে প্রথমবারের মতো প্রকৃত আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।

তবে আরও বড় সাফল্য তখনও তার অপেক্ষায় ছিল। সেই সাফল্যের শীর্ষে ছিল একই বছরে লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে খেলা তার দুর্দান্ত দ্বিশতরানের ইনিংস।

ইনিংসটি ছিল নান্দনিক সব শটের এক সমাহার। যারা সেই ইনিংস দেখেছিলেন, তারা প্রশংসা না করে থাকতে পারেননি।

লর্ডসে পাকিস্তানের প্রথম জয়ের ভিত গড়ে দেয় এই ইনিংস। এরপর মুদাস্সর নজর ছয়টি উইকেট নিয়ে ‘গোল্ডেন আর্ম’ বোলার হিসেবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু তখনও পরীক্ষার শেষ হয়নি।

জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল মাত্র ১৮ ওভারে ৭৬ রান। সে সময় দলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল প্রতিকূল আবহাওয়া।

এই পরিস্থিতিতে মহসিন খান ও জাভেদ মিয়াঁদাদ দ্রুতগতিতে রান তুলতে শুরু করেন। মাত্র ১৩.১ ওভারে দু’জনে পাকিস্তানকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন।

১৯৮২ সালটা ছিল মহসিন খানের ক্রিকেটজীবনের সেরা বছর। ওই বছর তিনি এক ক্যালেন্ডার বছরে এক হাজার রান পূর্ণ করা প্রথম পাকিস্তানি ব্যাটার হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

সেই বছর লর্ডসের দ্বিশতরানের পাশাপাশি ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধেও টেস্ট শতরান করেছিলেন তিনি। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই তিনটি শতরানই এসেছিল লাহোরের মাটিতে।

মোহসিন খান ও মিসবাহ-উল-হক (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ডন ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে দেখা না করতে পারার সুযোগ

মহসিন খানের আরেকটি স্মরণীয় সিরিজ ছিল ১৯৮৩-৮৪ মরসুমে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। সেই সিরিজে তিনি অ্যাডিলেডে ১৪৯ এবং মেলবোর্নে ১৫২ রানের দুটি অনবদ্য ইনিংস খেলেছিলেন।

এটাই ছিল কোনও পাকিস্তানি ব্যাটাররের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টানা দুটি টেস্ট ম্যাচে শতরান করার প্রথম ঘটনা। যে বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে তিনি এই সাহসী ইনিংসগুলো খেলেছিলেন, সেখানে তার বিপক্ষে ছিলেন ডেনিস লিলি, রডনি হগ, জেফ লসন এবং কার্ল রাকম্যানের মতো ভয়ঙ্কর গতির বোলাররা।

তবে আজও একটি বিষয় নিয়ে আক্ষেপ রয়ে গেছে মহসিন খানের। অ্যাডিলেড টেস্টে ওই ইনিংস খেলার সময় তিনি ‘কিংবদন্তি’ বলে পরিচিত স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।

ডন ব্র্যাডম্যান তার বিশেষ বক্সে বসে মোহসিন খানের ব্যাটিং দেখছিলেন। কিন্তু মোহসিন শতরান পূর্ণ করার আগেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে ব্র্যাডম্যানকে স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যেতে হয়।

ফলে ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটারের সঙ্গে সাক্ষাতের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায় মহসিনের। তবে পরে ইয়ান চ্যাপেল তাকে জানান, যতক্ষণ ব্র্যাডম্যান তার ব্যাটিং দেখেছিলেন, তাতেই তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ব্র্যাডম্যানের মন্তব্য ছিল, “এই ছেলেটা সত্যিই ব্যাটিং করতে জানে।”

একইভাবে, মেলবোর্নে দুর্দান্ত ইনিংস খেলার পর মোহসিন খান সম্পর্কে ডেনিস লিলি ইমরান খানকে বলেছিলেন, “আজ আমি বিশ্বের সেরা কিছু ব্যাটারের একজনকে বল করেছি।”

ইমরান খান যখন সেই মন্তব্যের কথা মোহসিন খানকে জানান, তখন তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি কি শুধু আমাকে খুশি করার জন্য এটা বলছেন?” জবাবে ইমরান খান বলেন, “না, এটা একেবারে সত্যি।”

১৯৭৮ সালে তোলা মহসিন খানের ছবি

ছবির উৎস, Rob Taggart/Central Press/Hulton Archive/Getty Images

চিফ সিলেক্টরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি

১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লাহোর টেস্ট চলাকালীন এক নাটকীয় ঘটনা মহসিন খানের ক্রিকেটজীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস তখনও শুরু হয়নি, এমন সময় খবর আসে যে, টেস্ট সিরিজ শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠিত হতে চলা ওয়ানডে সিরিজের দল থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

শুধু তাই নয়, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ইতিমধ্যেই দল ঘোষণার প্রেস বিজ্ঞপ্তিও প্রস্তুত করে রেখেছিল। বিষয়টি আরও বিস্ময়কর ছিল এই কারণে যে, নির্বাচকেরা টেস্ট ম্যাচ শেষ হওয়ার অপেক্ষাও করেননি। ম্যাচের তখনও একটি ইনিংস বাকি ছিল।

প্রথমে অবশ্য এই সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না মহসিন খান। তিনি বিষয়টি জানতে পারেন ঠিক তখনই, যখন দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি ব্যাট করতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে তার লক্ষ্য ছিল একটাই, এমন একটি ইনিংস খেলা যা নির্বাচকদের সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করবে। সেই লক্ষ্য পূরণ করেই তিনি খেলেন একটি দুর্দান্ত শতরানের ইনিংস। তার ব্যাটে সেই সেঞ্চুরি নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছিল।

মহসিন খান পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “শতরান করার পর যখন ড্রেসিংরুমে ফিরলাম, তখন সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দল ঘোষণা করার কথা ছিল। কিন্তু আমার এই শতরানের পর সেই ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “ঠিক সেই সময় প্রধান নির্বাচকও আমার কাছে এসে বললেন, তোমার পারফরম্যান্সে আমি খুবই খুশি। আশা করি পরের সিরিজেও তুমি একইভাবে খেলবে।”

তবে মহসিনের জবাব শুনে প্রধান নির্বাচক বিস্মিত হয়ে যান। মহসিন পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনারা কি আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন যে আমি আগামী সিরিজে খেলার জন্য উপলভ্য কি না?”

প্রধান নির্বাচক তখন বলেন, “তুমি আমার সঙ্গে এই ভঙ্গিতে কথা বলছ কেন, আমি বুঝতে পারছি না।”

এর উত্তরে মহসিন খান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই কথাগুলো নিজের কাছেই রাখুন। আপনি কাউকে বোকা বানাতে পারছেন না।” এমনকি তিনি এও জানান যে, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী সিরিজে খেলবেন কি না, আর চাইলে নির্বাচকরা সেই সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন।

মহসিন খান যে প্রধান নির্বাচকের সঙ্গে এই তিক্ত কথোপকথন করেছিলেন, তিনি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান দলের প্রধান নির্বাচক হাসিব আহসান।

১৯৭৮ সালে লর্ডসে মুদাস্সর নজর

ছবির উৎস, Mike Stephens/Central Press/Hulton Archive/Getty Images

মুদাস্সর নজরের সঙ্গে সফল জুটি

২০০৮ সালে উইজডেন টেস্ট ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সর্বকালের সেরা ১০টি ওপেনিং জুটির একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকায় মোহসিন খান ও মুদাস্সর নজরকে নবম সেরা ওপেনিং জুটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

টেস্ট কেরিয়ারে একসঙ্গে ওপেন করতে নেমে এই দু’জন ৫৪টি টেস্ট ইনিংসে মোট ২০৫৪ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁদের ঝুলিতে ছিল তিনটি শতরানের এবং ১৬টি অর্ধশতরানের জুটি।

সেই সময়ের বিচারে এটি ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম সফল ওপেনিং জুটিগুলোর একটি। পরিসংখ্যানের বাইরেও মহসিন খান ও মুদাস্সর নজরের সাফল্যের বড় কারণ ছিল তাঁদের অসাধারণ মানসিক বোঝাপড়া এবং একে অপরের খেলার ধরন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি।

পাকিস্তান ক্রিকেটে এর আগে এমন নিবিড় সমন্বয় দেখা গিয়েছিল মাজিদ খান ও সাদিক মোহাম্মদের ওপেনিং জুটির মধ্যে। মোহসিন-মুদাস্সর জুটি সেই ঐতিহ্যকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল এবং পাকিস্তানের ব্যাটিং ইতিহাসে নিজেদের একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল।

২০১২ সালে দুবাইয়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজ চলাকালীন পাকিস্তান দলের কোচ মোহসিন খান।

ছবির উৎস, LAKRUWAN WANNIARACHCHI/AFP via Getty Images

সেলুলয়েড থেকে ফের ক্রিকেট জগতে

বলিউডকে বিদায় জানানোর পর মহসিন খান আবারও ক্রিকেটের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলেন।

পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করেন এবং কিছু সময়ের জন্য জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবেও কাজ করেন। কোচ হিসেবে তার অন্যতম বড় সাফল্য ছিল বিশ্বের এক নম্বর দল ইংল্যান্ডকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করা।

সেই পাকিস্তান দলের অধিনায়ক ছিলেন মিসবাহ-উল-হক। মহসিন খানের কোচিংয়ে পাকিস্তান দল শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সফরেও টেস্ট, ওয়ান ডে এবং টি-টোয়েন্টি, তিন সংস্করণেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল।

তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। সেই কমিটিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ওয়াসিম আকরাম, মিসবাহ-উল-হক এবং উরুজ মুমতাজ।

মহসিন খান যখন ক্রিকেটার হিসেবে তার প্রথম অধ্যায়ের ইতি টানেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩১ বছর। সেই সময় বিশ্বের বহু ওপেনারই ভয়ংকর গতির বোলিংয়ের মুখোমুখি হয়ে চাপে পড়তেন।

কিন্তু মহসিন খানের ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি স্বাভাবিক ও সাবলীল ভঙ্গিতে ব্যাট করতেন।

তার মনোমুগ্ধকর স্ট্রোকপ্লের পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব ও স্টাইলও ছিল ক্রিকেট বিশ্বের আলোচনার বিষয়। মাঠে সাদা কিট এবং মাথায় টুপি পরে তিনি সতীর্থদের থেকে আলাদা ও স্বতন্ত্র উপস্থিতি তৈরি করতেন।

সম্ভবত তার এই আভিজাত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং তারকাসুলভ আকর্ষণই তাকে ক্রিকেট মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে বলিউডের জগতেও পৌঁছে দিয়েছিল। ক্রিকেটার হিসেবে সাফল্য, পর্দার জনপ্রিয়তা এবং পরে কোচ ও প্রশাসক হিসেবে অবদান, সব মিলিয়ে মহসিন খানের জীবন এক বিরল বহুমাত্রিক ক্রীড়া-যাত্রার উদাহরণ হয়ে আছে।

ক্রিকেট আর চলচ্চিত্র, কোনটি বেশি কঠিন—এই প্রশ্নের উত্তরে মহসিন খান স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে ক্রিকেটকেই বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন।

তার কথায়, “দুটো কাজই সহজ নয়। তবে ক্রিকেট অনেক বেশি কঠিন, কারণ এখানে প্রতিটি পারফরম্যান্স সরাসরি দর্শকদের সামনে হয় এবং ভুল করার কোনও সুযোগ থাকে না।”

তিনি আরও বলেন, “অন্যদিকে চলচ্চিত্রে শুটিংয়ের সময় রি-টেকের সুবিধা থাকে। একবার নয়, একাধিকবার ভুল হলেও সমস্যা নেই। শেষ পর্যন্ত সেরা দৃশ্যটিই বেছে নেওয়া যায়। কিন্তু ক্রিকেটে সেই সুযোগ নেই। মাঠে যা করবেন, সেটাই চূড়ান্ত।”

মহসিন খানের এই মন্তব্য তার জীবনের দুই ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শীর্ষ পর্যায়ে খেলার পাশাপাশি তিনি বলিউডেও সফলভাবে কাজ করেছেন। ফলে দুই ক্ষেত্রের চাপ, প্রস্তুতি এবং মানসিকতার পার্থক্য তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার মতে, অভিনয়ে দক্ষতা ও পরিশ্রম যেমন জরুরি, তেমনি ক্রিকেটে মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপের মধ্যে নিখুঁত পারফরম্যান্স দেওয়ার ক্ষমতা খেলোয়াড়কে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাড় করায়।