Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
” কল্পন া করুন, একদল হাজ ি চীন থেক ে যাত্র া শুর ু করলো, তুর্ক ি ভূখণ্ড ও মাওয়ারাউন-নাহর অতিক্রম করে, পারস্য ে নেম ে ইরাক ে পৌঁছালো, সেখান থেক ে আরব উপদ্বীপের হৃদয় ে কিংব া হিজাজ উপকূল ে গিয়ে, নবীর নগরীর দিক ে রওন া হয় ে শেষ ে মক্ক া নগর ে পৌঁছালো ।”
কায়র ো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক ডা. আতিফ মুতামিদের কল্পনায ় আঁক া এই যাত্র া শুধ ু কল্পন া নয়, প্রায ় এক হাজার বছর আগ ে অনেক হাজির বাস্তব অভিজ্ঞত া ছিল এটি । এই ভ্রমণ কখনও কয়েক মাস, কখনও এক বছর পর্যন্ত স্থায় ী হতো, এমনক ি ইবন ে জুবাইর ও ইবন ে বতুতার মত ো পর্যটকদের ক্ষেত্র ে বহ ু বছর পর তার া নিজ দেশ ে ফিরতেন।
সেই সময় ে হজ কেবল ধর্মীয ় আচার ছিল না, বর ং ছিল সংবাদ, জ্ঞান, ভাষ া ও অভিজ্ঞত া বিনিময়ের একট ি বড ় সুযোগ । হজ বাণিজ্যের সুযোগও তৈর ি করেছিল এব ং এই পথগুলোত ে স্থাপত্যকলার উন্নয়ন ঘটিয়েছিল।
ডা. মুতামিদ বিবিস ি আরবিক ে বলেন,” আধুনিকতার পূর্ববর্ত ী শতাব্দীগুলোত ে হজ সভ্যতাগত বিশ্বায়নের ধারণ া তৈর ি করেছিল, য া বর্তমান ‘ গ্লোবালাইজেশন’ শব্দটির বহ ু আগের।”
তিন ি বলেন,” হজের বিশ্বায়ন ছিল বিনিময়মূলক ও গঠনমূলক, একচেটিয় া ব া উপনিবেশবাদ ী নয়, এট ি সংস্কৃতি, জ্ঞান ও উপলব্ধির পারস্পরিক নৈকট্য সৃষ্ট ি করেছে ।”
ছবির উৎস, Getty Images
সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য
‘ ‘ এই পথগুল ো শুধ ু হাজিদের হজের স্থান ে পৌঁছ ে দেওয়ার মাধ্যম ছিল না, বর ং ছিল ইসলাম ি বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র ে প্রবাহমান ধমনী । সেইসাথ ে য া আবার উল্ট ো দিকেও প্রবাহিত হয় ে ইসলাম ি ঐতিহ্যক ে নতুন অঞ্চল ে ছড়িয় ে দিয়েছ ে এমন সময় ে যখন মুদ্রণ প্রযুক্ত ি ছিল না”, ডা. সাইয়্যেদ আবদুল মজিদ বকর তার বই হজপথের ভূগোলিক বৈশিষ্ট্য-এ উল্লেখ করেছেন।
এই পথগুলোর পাশ ে নির্মিত হয়েছিল মসজিদ, বিশ্রামাগার, প্রাসাদ, দুর্গ, খান, পানির ট্যাংক ও কূপ, য া ইসলাম ী সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে । ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণকারীর া এগুলোর বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
এই পথগুলোত ে তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ভাষ া ও সাহিত্যের আলেমদের সঙ্গ ে সাক্ষাতের সুযোগ তৈর ি হতো, য া বিস্তৃত ছিল দামেস্ক, জেরুজালেম, কুফা, বসরা, বাগদাদ এব ং কায়র ো হয় ে মক্ক া ও মদিন া পর্যন্ত।
হাজিদের যাত্রাপথে” মানাজিল” নাম ে পরিচিত বিরত ি কেন্দ্র ছিল, যেখান ে তাঁর া বিশ্রাম নিতেন । এগুল ো ছিল মানবিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অনন্য উদাহরণ।
চীন ও ভারত থেক ে শুর ু কর ে আটলান্টিক উপকূল এব ং ইউরোপ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল থেক ে হাজির া একত্র হতেন, এব ং শেষ পর্যন্ত তার া আরব ও ইসলাম ী বিশ্বের প্রধান হজপথগুলোত ে মিলিত হতেন, বিশেষ কর ে ইরাক, শাম ও মিসরের পথে।
মীকাত
মক্কার কাছাকাছ ি পৌঁছাল ে পাঁচট ি নির্দিষ্ট স্থানের ভিত্তিত ে কাফেলার গতিপথ নির্ধারিত হতো, যেগুল ো মক্কার প্রবেশদ্বার হিসেব ে বিবেচিত।
এই মীকাতগুল ো হল ো ভৌগোলিক সীমা, যেখান ে পৌঁছ ে হাজিদের ইহরাম পরিধান ও হজের নিয়ত করত ে হয়:
- যুলহুলাইফ া ( আবিয়ার আলী ) – মদিনাবাসীর জন্য
- জাত ু ইরক – ইরাকবাসীর জন্য
- কার্ন আল-মানাজিল ( আস-সাইল আল-কাবির ) – নাজদের জন্য
- আল-জুহফ া ( রাবেগ ) – মিসর ও শাম অঞ্চলের জন্য
- ইয়ালামলাম ( আস-সাদিয়া ) – ইয়েমেনবাসীর জন্য
Ancient Ministry of Religious Endowments web
ছবির উৎস, Getty Images
১- দারব জুবাইদ া ( জুবাইদ া পথ )
ইরাক থেক ে হজের এই পথটিক ে আরবর া আব্বাসীয ় খলিফ া হারুন আল-রশিদের স্ত্র ী জুবাইদার নামানুসারে” দারব জুবাইদ া” বল ে ডাকত, যিন ি কুফ া শহর থেক ে মক্ক া পর্যন্ত এই পথটির উন্নয়ন ে কাজ করেছিলেন এব ং পুর ো পথ জুড় ে পানির ব্যবস্থ া করেছিলেন।
ইরাকের হজযাত্রীদের জন্য এই পথট ি নতুন ছিল না । ইসলামের পূর্ব ে প্রাচীনকাল থেকেই নব ী ইব্রাহিমের সময় থেক ে এই পথ ধর ে” বাইতুল আতিক” ব া প্রাচীন গৃহের দিক ে যাত্র া করতেন । ইতিহাসবিদর া” আল-হির া- মক্ক া” পথের কথ া উল্লেখ করেছেন।
আল-হির া হল ো খলিফ া উমর ইবনুল খাত্তাবের আমল ে ইরাক বিজয়ের সময ় ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ ে ( ১৭ হিজরি ) কুফ া শহরের পরিবর্ত ে গড় ে ওঠ া বর্তমান কুফ া থেক ে ৩ মাইল দূরের একট ি শহর।
আব্বাসীয ় রাজবংশের শাসনামল ে দ্বিতীয ় হিজর ি শতক ে এই পথটির ব্যাপক উন্নত ি ঘট ে এব ং পুণ্যার্থীদের কাফেলার সংখ্য া বৃদ্ধ ি পায়, যার া বাগদাদক ে ইসলাম ি রাষ্ট্রের রাজধান ী হিসেব ে গ্রহণ করেছিল।
সৌদ ি আরবের ঐতিহাসিক গবেষণ া ও বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘ আল-দারাহ’ উল্লেখ করেছ ে যে, মামুন বিন আল-রশিদ যখন খিলাফতের দায়িত্ব নেন, তখন তিন ি” দারব জুবাইদ া” পরিমাপের নির্দেশ দেন এব ং দেখত ে পান য ে বাগদাদ থেক ে মক্ক া পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ছিল” ৭১২ আরব ি মাইল”, য া প্রায ় ১, ৩০০ কিলোমিটার।
হাজিদের পান ি পানের সুবিধার্থ ে একট ি ঝর্ণ া তৈরির কৃতিত্ব সাইয়্যেদ া জুবাইদার, য া তার নামেই পরিচিত । মক্ক া থেক ে প্রায ় ৩০ কিলোমিটার দূর ে ওয়াদ ি নুমান থেক ে এর উৎপত্তি, য া আজ অবধ ি একট ি চিরস্থায় ী সভ্যতার নিদর্শন হিসেব ে টিক ে আছে।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
দূরত্বের সংক্ষেপণ ব া বাধ া এড়ানোর জন্য রুট ে কিছ ু পরিবর্তনসহ দারব জুবাইদার ব্যবহার প্রায ় ১৩ শতাব্দ ী ধর ে অব্যাহত ছিল । এরপর ে ভ্রমণ মাধ্যমের পরিবর্তনের সাথ ে চতুর্দশ হিজর ি শতকের দ্বিতীয়ার্ধ ে বন্ধ হয় ে যায়।
ড. বকর তাঁর বইয় ে অনুমান করেছেন যে,” প্রত ি বছর এই পথ ব্যবহারকার ী কাফেলার সর্বনিম্ন আনুমানিক সংখ্য া” র ওপর ভিত্ত ি কর ে এই পথট ি ব্যবহারকার ী পুণ্যার্থীর সংখ্য া কয়েক কোটিত ে পৌঁছায়।
আজ এই পথট ি বিমান ে পাড় ি দিত ে প্রায ় এক ঘণ্ট া ব া তার কিছ ু বেশ ি সময ় লাগে, অথব া গাড়িত ে দুই দিনের যাত্রা, আর উটের পিঠ ে ভ্রমণকারীর জন্য এক মাসেরও বেশ ি সময ় লাগত ে পারে।
ড. আতেফ মোয়াতামেদ এই সংক্ষিপ্তকরণক ে” দূরত্ব এব ং ভূগোলের মৃত্য ু” হিসেব ে বর্ণন া কর ে বলেছেন,” গত শতাব্দ ী আমাদের হাজিদের সংখ্যায় একশ গুণ বেশ ি প্রাচুর্য এন ে দিয়েছে, কিন্ত ু এট ি তীর্থযাত্রীদের জন্য আর সেই একই অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এব ং আধ্যাত্মিক ভাবধার া বহন কর ে না ।”
তিন ি আরও যোগ করেন যে, যেটিক ে তিন ি” আধুনিকতার হজ” বল ে বর্ণন া করেছেন ত া মানুষের জন্য আচার-অনুষ্ঠান পালন সহজ করেছে,” কিন্ত ু এট ি তাদের সেই ইবাদতের অনেক আত্মিক প্রকাশ থেক ে বঞ্চিত করেছে, যেখান ে তার া দূর-দূরান্ত থেক ে আস া মানুষের সাথ ে মিলিত হতো ।”
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
২- আল-দারব আল-বাসর ি ( বসর া পথ )
ইরাকের এই পথট ি ( দারব জুবাইদা ) এর চেয় ে কম পরিচিত ছিল, য া দক্ষিণ ইরাকের বসর া শহর থেক ে হজযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য অসংখ্য স্টেশন হয় ে মক্ক া শহর পর্যন্ত যেত।
অ্যাটলাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. সাম ি আব্দুল্লাহ আল-মাগলুথ বলেন যে, দারব জুবাইদার তুলনায় এই পথট ি পর্যাপ্ত মনোযোগ পায়নি । এর কারণ উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের মত ো ট্রান্সঅক্সিয়ান া অঞ্চল থেক ে আস া হজযাত্রীর া তুর্কমেনিস্তান, তারপর ইরানের খোরাসান হয় ে ইরাক ে আসতেন এব ং ককেশাস অঞ্চলের পুণ্যার্থীরাও এর সাথ ে যুক্ত হতেন।
আল-মাগলুথ বিবিসিক ে ব্যাখ্য া করেন যে, এই হজযাত্রীর া সবাই জ্ঞানচর্চ া ও শিক্ষার আসর ে যোগ দিত ে বাগদাদ ে যাওয় া পছন্দ করতেন । তাই ইরাকের রাজধান ী কুফার কাছাকাছ ি হওয়ায় তাদের জন্য সবচেয় ে নিকটবর্ত ী পথ ছিল” দারব জুবাইদ া”, য া ইরাকের সুদূর দক্ষিণ ে অবস্থিত এব ং বাগদাদ থেক ে কুফার তুলনায় দ্বিগুণ দূরত্ব ে অবস্থিত বসরার চেয় ে সুবিধাজনক ছিল।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
৩- শাম ি হজের পথ ( সিরীয় পথ )
শাম ব া লেভান্ট অঞ্চল থেক ে দুট ি পথ ব া ধার া ছিল, একট ি বর্তমান জর্ডান ে অবস্থিত মাআন শহরের দিক ে যেত, তারপর তাবুক হয় ে মদিন া মুনাওয়ারায ় পৌঁছাত।
ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের দক্ষিণ অংশ থেক ে আকাব া পর্যন্ত আরেকট ি পথ ছিল, য া মিশরের হজের পথের সাথ ে মিলিত হওয়ার আগ ে ( গাজ া পথ ) নাম ে পরিচিত ছিল।
শামের এই পথট ি কয়েকট ি ধাপ অতিক্রম করেছে।
প্রথম ধাপট ি ক্রুসেড যুদ্ধ পর্যন্ত স্থায় ী হয়েছিল । যখন ক্রুসেডারর া জর্ডানের কারাক শহর দখল কর ে নেয়, য া পুণ্যার্থীদের কাফেলার একট ি প্রধান স্টেশন ছিল।
এর ফল ে তার া তাদের রুট পরিবর্তন কর ে ইরাক ি হজের পথের সাথ ে যোগ দিত ে বাধ্য হয় এব ং এট ি পুনরায় আগের অবস্থায় ফেরার আগ ে দুই শতাব্দ ী ধর ে এভাব ে চলেছিল।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, হিজাজ পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের মাধ্যম ে শাম ি হজের পথ ে অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখ া যায়, যার ফল ে ভ্রমণের সময় এক মাসেরও বেশ ি সময় থেক ে কম ে প্রায় চার দিন ে নেম ে আসে । এই ট্রেনের স্টেশনগুল ো শামের হজযাত্রীদের স্থলপথের স্টেশনগুলোর সাথ ে হুবহ ু মিল ে যেত।
ড. বকরের মতে, উসমানীয ় সুলতান দ্বিতীয ় আব্দুল হামিদের আদেশ ে ১৯০০ সাল থেক ে এই রেলপথ নির্মাণ ে আট বছর সময ় লেগেছিল এব ং প্রথম ট্রেনট ি ১৩২৬ হিজরির শাবান মাস ে ( ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ ) মদিন া মুনাওয়ারায ় পৌঁছায়।
পরবর্তীত ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময ় হিজাজ রেলপথ ধ্বংস হয় ে যায় এব ং ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্য ে এট ি ধ্বংসাবশেষ ে পরিণত হয়।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
ছবির উৎস, Getty Images
৪- মিশরীয ় হজের পথ
এই পথট ি কায়র ো ব া ( ফুস্তাত ) থেক ে শুর ু হতো, য া মিশরের এব ং আফ্রিকার প্রথম ইসলামিক রাজধানী, য া খলিফ া উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামল ে ২১ হিজর ি ব া ৬৪১ খ্রিস্টাব্দ ে আমর ইবনুল আস প্রতিষ্ঠ া করেছিলেন।
এই পথটির দৈর্ঘ্য প্রায ় ১৫০০ কিলোমিটার এব ং এট ি পাড় ি দিত ে এক মাসেরও বেশ ি সময ় লাগত।
ড. মোয়াতামেদ বিবিসিক ে বলেন যে, মিশরের হজের কাফেল া আন্দালুস, মাগরেব ( মরক্কো ), উত্তর আফ্রিক া এব ং আফ্রিকান মহাদেশের পশ্চিম ে অবস্থিত তিকরুর দেশের পুণ্যার্থীদের পাশাপাশ ি সুদানের পুণ্যার্থীদেরও একত্রিত করত।
মোয়াতামেদের মতে, কিছ ু উৎস এমনক ি ইঙ্গিত কর ে য ে মিশরের হজের কাফেল া রাশিয় া এব ং ইউরোপের মুসলিম পুণ্যার্থীদেরও স্বাগত জানাত, যখন তার া কৃষ্ণ সাগর থেক ে ভূমধ্যসাগর হয় ে সামুদ্রিক পথ ধর ে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছাতেন এব ং তারপর কায়র ো থেক ে রওন া হওয় া মিশরীয ় কাফেলায ় যোগ দিতেন।
ভৌগোলিক ড. বকরের মতে, মিশরীয ় হজের পথট ি চারট ি ধাপ অতিক্রম করেছে।
প্রথম ধাপ: এই যাত্রাট ি ছিল স্থলপথের, য া ফুস্তাতের ( জুব উমাইরাহ ) নামক একট ি এলাক া থেক ে শুর ু হতো, য া আজ কায়রোর পূর্ব ে ( বিরকাত আল-হাজ ) নাম ে পরিচিত । সেখান থেক ে উটের কাফেল া মরুভূমির মধ্য দিয় ে কুলজুমের দিক ে যেত, য া সুয়েজ শহরের প্রাচীন নাম।
সুয়েজ থেক ে হজযাত্রীদের কাফেল া সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম থেক ে পূর্ব ে পাড় ি দিয় ে সিনাইয়ের কেন্দ্র ে অবস্থিত এর প্রাচীন রাজধান ী” নিখিল” শহর হয় ে কুলজুম সাগর ( লোহিত সাগর ) বরাবর বর্তমান জর্ডানের সুদূর দক্ষিণ ে অবস্থিত আইল া ( আকাবা ) শহর ে পৌঁছাত।
আকাব া থেক ে যাত্রাট ি দক্ষিণের মাদইয়ান, তারপর আল-জার ( আল-রায়িস ) -এর দিক ে অগ্রসর হতো, য া মদিন া মুনাওয়ারার প্রাচীন বন্দর ছিল । সাধারণত মক্কায ় যাওয়ার আগ ে এট ি হজযাত্রীদের প্রথম স্টপেজ হতো।
সৌদ ি অ্যাটলাস বিশেষজ্ঞ ড. মাগলুথ বলেন যে, হজযাত্রীদের মন মক্কায ় আচার-অনুষ্ঠান পালনের আগ ে ইসলামের নব ী মুহাম্মদের শহর জিয়ারত করার জন্য” আকুল” হয় ে উঠত, তাই তার া” নবীর প্রত ি সম্মান ও সালাম জানানোর তাগিদ ে” প্রথম ে মদিনার দিক ে যেতেন।
দ্বিতীয ় ধাপট ি নীল নদ দিয় ে ফুস্তাত থেক ে মিশরের কুস পর্যন্ত শুর ু হতো, তারপর হজযাত্রীর া কুস থেক ে মিশরের দিক ে কুলুম সাগরের ( লোহিত সাগর ) উপকূল পর্যন্ত পথ পাড় ি দিতেন।
সেখান ে মিশরের দক্ষিণ ে অবস্থিত ( আইদাব ) বন্দর ছিল । আইদাব থেক ে হজযাত্রীর া ( জালাব ) নামক ছোট নৌকায় উঠতেন, য া পেরেক ছাড়াই দড় ি দিয় ে বাঁধ া কাঠ দিয় ে তৈর ি হতো । এগুল ো দিয় ে তার া জেদ্দার দিক ে যেতেন এব ং সেখান থেক ে উটের পিঠ ে মক্ক া ও মদিনায ় পৌঁছাতেন।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
ড. আতেফ মোয়াতামেদ বলেন য ে মধ্যযুগের ভ্রমণকারীর া আইদাব বন্দরের এই নামকরণের কারণ ব্যাখ্য া কর ে বলেছেন য ে এট ি হজযাত্রীদের কষ্ট ও ক্লান্ত ি ( আযাব ) থেক ে উদ্ভূত হয়েছে।
মিশরীয ় ইতিহাসবিদ তাকিউদ্দিন আল-মাকরিজ ি উল্লেখ করেছেন যে, মিশর এব ং মরক্কোর হজযাত্রীর া সুয়েজ ও সিনাই হয় ে স্থলপথের পরিবর্ত ে দুই শতাব্দ ী ধর ে এই পথট ি ব্যবহার করেছিলেন । ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ ব া ৪৫০ হিজর ি থেক ে ক্রুসেড যুদ্ধের কারণ ে এই প্রাচীন পথট ি পরিহার কর ে নতুন পথ বেছ ে নেওয় া হয়েছিল যাত ে বিপদ এড়ান ো যায়।
তৃতীয ় ধাপ: সুয়েজ ও সিনাই হয় ে প্রথম স্থলপথ ে প্রত্যাবর্তন।
শাজার আল-দুর ১২৪৭ খ্রিস্টাব্দ ব া ৬৪৫ হিজরিত ে এই প্রত্যাবর্তনের সূচন া করেন । শাজার আল-দুর হলেন আইয়ুবীয ় সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবের মৃত্যুর পর ইসলাম ি ইতিহাস ে মিশরের সিংহাসন ে বস া প্রথম নারী।
এই রুট ে সামান্য কিছ ু পরিবর্তন হয়েছিল, যেমন আল-জারের পরিবর্ত ে ইয়ানব ু বন্দর ে নোঙর করা।
চতুর্থ ধাপ: কায়র ো থেক ে সুয়েজ পর্যন্ত ট্রেন ে যাত্রা, য া ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ ব া ১২৭৫ হিজরিত ে ওয়াল ি মোহাম্মদ সাঈদ পাশার আমল ে নির্মিত হয়েছিল।
সুয়েজ থেক ে হজযাত্রীর া সমুদ্রপথ ে জেদ্দ া বন্দর ে যেতেন এব ং সেখান থেক ে মক্ক া ও মদিনায ় যেতেন।
আজ, মিশরীয ় হজযাত্রীর া কায়র ো থেক ে জেদ্দায ় বিমান ে দুই ঘণ্টায ় ভ্রমণ করেন এব ং সেখান থেক ে মক্ক া ব া মদিনায ় যান, যেখান ে অতীত ে তাদের মরুভূমিত ে চল্লিশ দিন ভ্রমণ করত ে হতো।
ড. মোয়াতামেদ বিবিসিক ে মন্তব্য করেছেন যে, তাঁর ভাষায়” গ্রাসকার ী বিশ্বায়নের” যুগ ে আধুনিক হজযাত্রীদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখ ি করেছ ে” যা তাদের কোন ো আত্মিক লাভ ছাড়াই কেবল খাদ্য ও পানীয ় ভোগের আকাঙ্ক্ষ া এব ং মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ছবির বন্দ ি কর ে রাখত ে চায়, য া নিয় ে মানুষ কাবার চত্বর ে মগ্ন থাকে, অথচ তাদের পূর্বপুরুষর া সেখান ে জিকির, তাসবিহ এব ং ক্ষম া প্রার্থন া করতেন ।”
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
৫- আফ্রিকান হজের পথ
এট ি উল্লেখযোগ্য য ে আফ্রিকায ় হজযাত্রীদের কাফেলার জন্য অন্যান্য পথও ছিল, তব ে ড. মাগলুথের মত ে সেগুল ো মিশরীয ় পথের চেয় ে কম পরিচিত ছিল, যেমন পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার হজযাত্রীদের স্থলপথ।
তিন ি বিবিসিক ে ব্যাখ্য া করেছেন যে, এট ি” এমন একট ি পথ য া এর বিপজ্জনক প্রকৃতির কারণ ে সাময়িক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল”, কারণ এই পথের যাত্র া প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাত ে পারত।
এই স্থলপথট ি পূর্ব দিক ে সুন্নার শহর হয় ে সুদানের খার্তুম, তারপর বারবার এব ং লোহিত সাগরের সুদান ি বন্দর সুয়াকিন পর্যন্ত যেত, যেখান থেক ে হজযাত্রীর া সমুদ্রপথ ে বিপরীত দিক ে জেদ্দ া বন্দর ে পৌঁছাতেন । এই যাত্রায় হয়ত ো এক বছর ব া তারও বেশ ি সময় লেগ ে যেত।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
আফ্রিকার শি ং ( হর্ন অব আফ্রিকা ) অঞ্চলের দেশগুলো, য া মিশর ও শাম ে জাইল া দেশ নাম ে পরিচিত ছিল, সেখানকার হজযাত্রীর া ভারত মহাসাগরের উপকূল ধর ে সোমালিয়ার জাইল া বন্দর পর্যন্ত একট ি স্থলপথ ব্যবহার করতেন । সেখান থেক ে বাব আল-মান্দাব প্রণাল ি হয় ে জেদ্দায ় যেতেন।
এছাড়াও ভারত মহাসাগরের কমোরোস দ্বীপপুঞ্জ থেক ে জাঞ্জিবার হয় ে এডেন উপসাগর এব ং বাব আল-মান্দাব প্রণাল ি পেরিয় ে জেদ্দ া বন্দর পর্যন্ত একট ি সামুদ্রিক পথ ছিল।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
৬- ইয়েমেন ি হজের পথ
এই পথট ি সান া থেক ে শুর ু হয় ে সয়দ া এব ং জুরাশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের কাছাকাছ ি আসির পর্বতমালা, তারপর বিশা, তাবাল া কেন্দ্র এব ং তুরাবাহ শহর হয়ে কারনুল মানাজিল ( যা আজ আস-সায়লুল কাবির নাম ে পরিচিত ) পর্যন্ত পৌঁছাত, য া নজদবাসীদের হজের মিকাত।
কখনও কখনও ইয়েমেনের হজযাত্রীর া তাবাল া থেক ে লোহিত সাগরের উপকূল ে ইয়েমেনবাসীদের মিকাত ইয়ালামলামের পথ ধরতেন, য া মক্ক া থেক ে প্রায ় ১২০ কিলোমিটার দূর ে অবস্থিত এব ং বর্তমান ে সৌদ ি আরবের আল-লিথ গভর্নরেটের অধীনস্থ ( আস-সাদিয়া ) নাম ে পরিচিত।
ড. মাগলুথ উল্লেখ করেন যে, কি ং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন রশিদ আল-থুনাইয়ান এই সিদ্ধান্ত ে উপনীত হয়েছেন যে, প্রাচীনকাল ে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত পথটিই ইসলামের পর ইয়েমেনের হজযাত্রীর া হিজাজ ে পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
ওমান ি হজের পথ
এই পথট ি দুট ি রুট ে বিভক্ত ছিল, একট ি ওমান থেক ে ( ইয়াবরিন ) পর্যন্ত যেত, য া রিয়াদের ২১০ কিলোমিটার দক্ষিণ ে এব ং সৌদ ি আরবের রুব আল-খাল ি মরুভূমির উত্তর-পশ্চিম ে অবস্থিত একট ি মরূদ্যান।
ড. মাগলুথের মতে, এর পর কাফেলাগুল ো ইয়ামাম া এব ং তারপর দারিয়াহর দিক ে যেত, য া বসর া ও বাহরাইন ( আরব উপদ্বীপের পূর্ব অঞ্চল ) থেক ে আস া হজযাত্রীদের মিলনস্থল ছিল।
আর দ্বিতীয ় রুটট ি বর্তমান ওমান সালতানাতের নিজওয় া প্রদেশের ফিরাক গ্রাম, তারপর আওকালান, তারপর হাবাত উপকূল এব ং এরপর আল-শিহর পর্যন্ত যেত, য া ভারত মহাসাগর ে হাজরামাউতের প্রবেশদ্বার ছিল।
এর পর কাফেলাগুল ো মক্কার দিক ে যাওয় া প্রধান ইয়েমেন ি পথগুলোর একট ি ধর ে যাত্র া করত।
ইয়েমেনে, ওমান ি হজযাত্রীর া হয ় লোহিত সাগরের সমান্তরাল ে জেদ্দ া হয় ে মক্ক া পর্যন্ত উপকূলীয ় হজের পথ, অথব া ইয়েমেন থেক ে মক্ক া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ পথ ব্যবহার করতেন।
Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth’s Hajj and Umrah Atlas, Hajj and Umrah Atlas
৮- হাজার ি হজের পথ ( আল-আহস া পথ )
এই পথট ি আরব উপদ্বীপের পূর্ব অঞ্চলের হজযাত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করত, য া আজকের উপসাগরীয ় দেশগুল ো নাম ে পরিচিত এব ং এর দৈর্ঘ্য আল-আহস া থেক ে শুর ু কর ে প্রায ় ১, ২০০ কিলোমিটার ছিল।
আজকের পূর্ব সৌদ ি আরব ে অবস্থিত আল-আহস া শহরটিক ে প্রাচীনকাল ে ( হাজার ) বল া হত ো এব ং এট ি বসরার দক্ষিণ থেক ে ওমান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত একট ি অঞ্চল ে অবস্থিত ছিল যাক ে ( বাহরাইন ) বল া হতো।
এর সাথ ে আজকের একই নামের উপসাগরীয ় রাষ্ট্রের কোন ো সম্পর্ক নেই, য া ড. মাগলুথের মত ে প্রাচীনকাল ে ( উয়াল ) দ্বীপ নাম ে পরিচিত ছিল।
এই পথট ি পারস্য উপসাগরের উপকূলের কাতিফ শহর ( যাক ে প্রাচীনকাল ে আল-খাত বল া হতো ) থেক ে শুর ু হতো, মুবাররাজ হয় ে য া কাতার থেক ে আস া কাফেলাগুলোর হাজর া থেক ে রওন া হওয়ার আগ ে একত্রিত হওয়ার স্টেশন ছিল, এরপর নজদ হয় ে মক্কায় পৌঁছাত।
সৌদ ি আরবের জেনারেল অথরিট ি ফর সার্ভ ে এব ং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের উপদেষ্ট া হিসেব ে কর্মরত মাগলুথের মতে, এই পথট ি কাতিফের পার্শ্ববর্ত ী জুবাইল থেক ে শুর ু হয় ে নজদের কেন্দ্রস্থল দিয় ে মদিন া পর্যন্তও যেত ে পারত।
ছবির উৎস, Getty Images
মক্কার উদ্দেশ্য ে রওন া হওয় া হজযাত্রীদের মহাকাব্যিক যাত্রাগুলোর দিক ে তাকালে, ইসলামের পবিত্র ভূম ি থেক ে দূর ে বসবাসকার ী মুসলমানদের কাছ ে ‘ হাজ ি ‘ উপাধির গভীর গুরুত্ব অনুধাবন কর া যায়।
সাইয়্যেদ আবদেল-মাজিদ বকর তাঁর গ্রন্থ ে লিখেছেন,” তার া দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন, পাথর ও শিল া তাদের প া রক্তাক্ত করেছিল এব ং প্রাচীন গৃহের যাত্রায় তার া ক্ষুধ া ও তৃষ্ণ া সহ্য করেছিলেন ।”
আজ, ড. আতেফ মোয়াতামেদ” আধুনিক যুগের” হজের সমালোচন া করেন, য া এর সুবিধ া থাক া সত্ত্বেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈর ি করেছে, যার প্রকাশ ঘট ে খাদ্য ও পানীয ় ভোগের আকাঙ্ক্ষ া এব ং মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ছবিত ে” যা মানুষ কাবার চত্বর ে দাঁড়িয় ে ব্যবহার করে, অথচ তাদের পূর্বপুরুষর া সেখান ে জিকির, তাসবিহ এব ং ক্ষম া প্রার্থন া করতেন ।”







